বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর এর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেপিমরগান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমন। সম্প্রতি পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিসকে (পিবিএস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ডলার তার রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদাও হারাবে। "আগামী ২৫ বছরে আমরা যদি সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি না থাকি, তাহলে আমরাও রিজার্ভ মুদ্রা থাকব না," বলেন তিনি। "বিশ্ব তখন খণ্ডিত হয়ে যাবে, আর আমাদের জন্য তা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।"
প্রথম দৃষ্টিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ডলারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে হলেও, সিরাকিউজের ময়নিহান ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী পরিচালক ড্যানিয়েল ম্যাকডাওয়েলের মতে, মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ডলারের সাথে "অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত"। তিনি ফরচুনকে বলেন, "তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন যে, দুর্বল সামরিক বাহিনী দুর্বল অর্থনীতির লক্ষণ, আর ফলস্বরূপ মুদ্রার মানও দুর্বল হবে বলে আশা করা যায়। অর্থনীতিকে যদি ডলারের আধিপত্যের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সামরিক বাহিনী হলো সেই কেকের ওপরের ক্রিম।"
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ম্যাকডাওয়েল জোর দিয়ে বলেছেন যে, অর্থনৈতিক শক্তিই ডলারের শক্তির সবচেয়ে বড় সূচক। তবে তিনি এমন কিছু পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছেন যেখানে শক্তিশালী মার্কিন অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও দুর্বল সামরিক বাহিনীর কারণে ডলারের আধিপত্যে আঘাত আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। যদি মিত্র দেশগুলো মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, তাহলে তারা সেখানে তাদের ডলার-নির্ধারিত সম্পদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। ম্যাকডাওয়েল বলেন, "একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী মুদ্রাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে, কারণ এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সংকেত দেয় যে তাদের সম্পদ নিরাপদ। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের আর্থিক নিয়মকানুন থেকে ভিন্নভাবে সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।"
একইভাবে, মার্কিন সামরিক বাহিনী দুর্বল হলে এবং মিত্ররা প্রয়োজনে তাদের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে পারবে না বলে আশঙ্কা করলে, তারা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনা বা দেশে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। ম্যাকডাওয়েলের ভাষ্য, "যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য দেশগুলিকে রক্ষা করতে না পারলে, সেই দেশগুলোর কাছে ডলার কিছুটা কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়বে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকারকে ডলার ঋণ দেওয়া মানে সেই প্রতিরক্ষার খরচ মেটাতে সাহায্য করা, যার সুবিধা তারা ভোগ করে।"
আরেকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং "নির্ধারকভাবে পরাজিত হয়"। তাহলে বাজারগুলিতে এর প্রভাব পড়বে এবং বিশ্ব দেশটিকে ক্ষীণ শক্তি হিসেবে দেখতে পারে, যা "ডলারের ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে"। ম্যাকডাওয়েল বলেন, "আমি মনে করি ইরান এখানে ভালো উদাহরণ নয়, কারণ এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। তবে ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্র তাত্ত্বিকভাবে কোনো বড় শক্তির সাথে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং জয়লাভ না করে, তাহলে আমি মনে করি এর মার্কিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুনামের ওপর প্রভাব পড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে ডলারের ওপরও তা প্রভাব ফেলবে।"
তবে ডলারের শক্তিতে প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা—অর্থাৎ কত দ্রুত একটি অর্থনীতি উদ্ভাবন করে এবং সম্পদ স্থানান্তর করে—সেগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অর্থনৈতিক গবেষণার সিনিয়র ফেলো এসওয়ার প্রসাদ ফরচুনকে বলেন, এই উপাদানগুলো "রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদার জন্য অর্থনীতির আকার বা সামরিক শক্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ"। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, "অবশ্যই, মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দুর্বলতা এবং এর অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষয় ডলারের আধিপত্যে আঘাত হানবে। তবে গুরুতর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর অনুপস্থিতি এটিকে প্রধান আন্তর্জাতিক লেনদেন ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে স্থানচ্যুত হতে বাধা দেবে।"




