ফুটবল মাঠের নাটকীয়তার মতোই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক অঙ্ক হঠাৎ করেই বদলে গেছে। চতুর্থ মেয়াদে পুনর্নির্বাচনকে অনেকদিন ধরেই নিছক আনুষ্ঠানিকতা বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের কয়েকটি আত্মঘাতী কৌশলে তার সেই প্রায় নিশ্চিত জয় এখন হারের শঙ্কায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এক রাতে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন আসরের বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির নীলনকশা তারা বাতিল করছে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি স্বস্তির খবর হলেও ইনফান্তিনোর জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা, যা প্রমাণ করে তিনি একটি অপ্রয়োজনীয় লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছেন।

মরক্কোর মার্চে আসন্ন ফিফা কংগ্রেসে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু বিশ্বকাপ বিক্রির প্রস্তাবটি সামনে আসার মাত্র তিন দিনের মাথায় পুরো চিত্রটিই পাল্টে যায়। ইনফান্তিনোর সবচেয়ে অনুগত কনফেডারেশনগুলে পর্যন্ত ক্ষোভে ফেটে পড়ে, কারণ তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এই পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সমালোচকরা অভিযোগ তোলেন যে ইনফান্তিনো ফুটবলের আত্মাকেই বিক্রি করে দিতে চাইছিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীর্ষরাও ধীরে ধীরে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেন।

উয়েফা গতকাল এক বিবৃতিতে প্রস্তাব প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। তারা বলে, অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত গোপন কোনো চুক্তি আর সহ্য করা হবে না এবং এই অপকর্মের মূলহোতাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের মতে, বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব কেবল উয়েফার নয়, ফুটবল সমাজের অধিকাংশ সদস্যের আস্থাই হারিয়ে ফেলেছে। ২০১৬ সালে সেপ ব্লাটারের পতনের পর ‘স্বচ্ছতার’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা ইনফান্তিনোর স্বৈরাচারী মনোভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে বিশাল অঙ্কের বেসরকারি বিনিয়োগের একটি প্রকল্পও উয়েফার কঠোর বিরোধিতায় আটকে গিয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে তার একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব কোনো আনুষ্ঠানিক দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে সৌদি আরবকে দিয়ে দেওয়া, অথবা লিওনেল মেসির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে ইন্টার মায়ামির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা—এসব তাকে আগে বড় কোনো সমস্যায় ফেলেনি। ফিফার কোষাগার সবসময় পূর্ণ রাখতে পারার কৃতিত্বই তাকে বারবার রক্ষা করে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, ফিফার নিজস্ব ‘পিস প্রাইজ’ তৈরি করে ট্রাম্পের হাতে তুৃলে দেওয়া, এবং বিশ্বকাপ চলাকালে মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড প্রত্যাহারে ট্রাম্পের সরাসরি ফোনে হস্তক্ষেপের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের সৃষ্টি করছিল।

ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সম্মিলিতভাবে এই বিশ্বকাপ বিক্রির চুক্তি সাজানোর গুঞ্জন সে আগুনে ঘি ঢেলেছে। কোষাগার ভরিয়ে তোলার যে পুরনো কৌশল তিনি বরাবর অবলম্বন করে আসছেন, তা এবার বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। তবুও পঞ্চাশোর্ধ্ব এই প্রশাসককে এখনই শেষ বলে ধরে নেওয়া হবে বোকামি। তাকে সরাতে প্রয়োজন ৪৩টি সদস্য দেশের অনাস্থা প্রস্তাব এবং একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, যে আপাতত দৃশ্যপটে অনুপস্থিত। আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা ঘোষণার সময়সীমা শেষ হবে এবং ভোট হবে পরবর্তী বছর ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে। এখনও ট্রাম্প, কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালীদের সমর্থন তার পক্ষে রয়েছ। যে দিন পর্যন্ত তাদের সমর্থন থাকবে, ততদিন ইনফান্তিনোকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তবে ইতিহাস বলে, যারা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন, ক্ষমতাবানেরা তাদের সহজেই ছুঁড়ে ফেলে দেন। পরিকল্পনা ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেলে হয়তো তিনিও অচিরেই টের পাবেন যে তার প্রভাবশালী বন্ধুরা আর ফোন ধরছেন না। যোগ করা সময়ের এই কঠিন খেলায় একটি ক্ষুদ্র ভুলই তার সিংহাসন কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।