এআই উন্নয়নকারী সংস্থা ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরুদ্ধে অনলাইনে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন লেখক, সংরক্ষণবিদ, ইতিহাসবিদ ও বইপ্রেমীরা। ক্রমবর্ধমান প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, বড় ভাষা মডেল (LLM) প্রশিক্ষণের জন্য তারা ব্যাপক পরিমাণে বিরল ও প্রাচীন বই কিনে নিচ্ছে—কিন্তু মূল মুদ্রিত কপিগুলোর মলাট কেটে সেগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
গত বছর লেখকদের দায়ের করা একটি মামলার নথি থেকে জানা যায়, অ্যানথ্রপিক নামক কোম্পানিটি লক্ষ লক্ষ বই কিনে সেগুলোর বাঁধাই ছিঁড়ে হাই-স্পিড স্ক্যানারে পাতা চালিয়ে মূল কপিগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যে পরিণত করেছে। 'প্রজেক্ট পানামা' নামের এই প্রকল্পে তারা ঠিকাদার নিয়োগ করেছিল। এরপরই ২০২২ সালের আগে ছাপা বইয়ের বিক্রিতে ঐতিহাসিক উত্থান দেখা যায়, এবং বই বিক্রেতারা সন্দেহ করতে শুরু করেন যে এআই কোম্পানিগুলোই তাদের প্রধান ক্রেতা।
বইপ্রেমী ও এআই-বিরোধীরা এই কার্যকলাপকে 'মূর্তিমান পাপ' আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানালেও, ৪০৪ মিডিয়া এবং অন্যান্য সংস্থার আরও তদন্তে দেখা গেছে শুধু বেস্টসেলার নয়, বরং দুর্লভ, পুরনো ও মুদ্রণ-নিঃশেষিত বইও এই ধ্বংসের শিকার হচ্ছে। প্রযুক্তি সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠিত ৪০৪ মিডিয়া সোমবার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, প্রায় ১,০০০ বইয়ের অর্ডার পাওয়া এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্রেতা সেগুলোর একটি বইয়ের ভেতরে অ্যাপল এয়ারট্যাগ ঢুকিয়ে দেন। ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়, প্যাকেজটি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মিলওয়াকি, কলোরাডো স্প্রিংস হয়ে শেষে অ্যামাজনের একটি গুদামে পৌঁছায়, যার কোড 'VGT3'। ওই ভবনের প্রবেশপথে একটি টি-রেক্সের লোগো রয়েছে যা একটি খোলা বই খেতে উদ্যত, এবং কর্মীরা সেখানে কাজকে 'চমৎকার' বলছেন কারণ সারাদিনে তাদের শুধু বই স্ক্যান করাই কাজ।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল উৎস ব্যবহার করে এলএলএম প্রশিক্ষণে দুটি বড় সমস্যা ছিল—আইনি দায় এবং তথ্যের মান। অনলাইন পাইরেটেড আর্কাইভ বা 'শ্যাডো লাইব্রেরি' ব্যবহার করায় লেখক, শিল্পী, ফটোগ্রাফার ও সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে বিশাল কপিরাইট মামলার মুখোমুখি হচ্ছিল এআই সংস্থাগুলো। কিন্তু শারীরিক বই কেনা আইনত মালিককে সেই কপি ব্যবহারের অধিকার দেয়—এমনকি ধ্বংস করারও। এছাড়া, এই পদ্ধতিতে এমন লক্ষ লক্ষ বইয়ের অ্যাক্সেস মেলে যা শুধুমাত্র মুদ্রিত আকারে বিদ্যমান। ২০২২ সালের আগে ছাপা বই কিনলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেই লেখা এআই-এর প্রভাবে দূষিত নয়, কারণ বর্তমান ইন্টারনেট এআই-লিখিত পাতায় ভরা। অন্যদিকে, শারীরিক বই মানব-রচিত, সম্পাদিত এবং দীর্ঘ যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা ধারণ করে।
কপিরাইট আইনের 'ফার্স্ট-সেল ডকট্রিন' অনুযায়ী, বৈধভাবে কেনা বই ধ্বংস করার অধিকার ক্রেতার রয়েছে। বিভিন্ন মামলার রায়ে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণের জন্য বইয়ের ডিজিটাল কপি তৈরি করা 'পরিবর্তনমূলক ন্যায্য ব্যবহার'। সমালোচকরা বলছেন, নির্মাতাদের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে ডেটাসেট তৈরির আইনি ফাঁক খুঁজে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো, তবে এই কার্যকলাপ এখনও বৈধ।
অ্যানথ্রপিকের মামলার নথি অনুযায়ী, একটি ছয় মাসের ঠিকাদার চুক্তিতে ৫০০,০০০ থেকে ২০ লক্ষ বই স্ক্যান করার পরিকল্পনা ছিল। অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছিল, 'পৃথিবীর সব বই ধ্বংসাত্মকভাবে স্ক্যান করা' হবে। ৪০৪ মিডিয়ার সূত্রে জানা যায়, প্রতি ক্রয়ে ১,০০০ থেকে ১০ লক্ষ বইয়ের বেনামী অর্ডার আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের ব্যবহৃত বই বিক্রেতারা জানান, র্যান্ডম নন-ফিকশন ও অপ্রকাশিত বইয়ের পাইকারি অর্ডার সাধারণত শত শত থেকে হাজার হাজার শিরোনামের হয়ে থাকে।




