বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাকৃতির রোবট নির্মাতা ইউনিট্রি রোবোটিকস বুধবার সাংহাই শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে লেনদেন শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ৬০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি ১ হাজার ১০০ ইউয়ানে (প্রায় ১৬৩ মার্কিন ডলার) লেনদেন শুরু হয়, যা পরে কিছুটা সংশোধিত হয়ে প্রায় ৯০০ ইউয়ানে স্থির হয়। মূল ভূখণ্ড চীনে মানবাকৃতির রোবট নির্মাণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের এটি প্রথম তালিকাভুক্তি, যা দেশটির রোবটশিল্পের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। প্রায়ই চীনের 'ন্যাসডাক' হিসেবে অভিহিত স্টার মার্কেটে এই অভিষেক ঘটল এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বব্যাপী রোবট ও সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেলের বাজারে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। অবশ্য এর আগে ইউবিটেক রোবোটিকসের মতো ছোট একটি চীনা কোম্পানি হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। সম্প্রতি ইউবিটেক তাদের 'অত্যন্ত বাস্তবসম্মত' রোবট উন্মোচন করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে, যেগুলো মানুষের সঙ্গে আবেগগত সহায়তা ও দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইউনিট্রি ও ইউবিটেকের পথ অনুসরণ করে লেজু রোবোটিকস, এজিবটসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগামী মাসগুলোতে শেয়ারবাজারে আসতে পারে। শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র থেকে শুরু করে গৃহস্থালির স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার—নানা ধরনের রোবট ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হলেও মানুষের মতো দেখতে ও দ্বিপদীভাবে চলাচলে সক্ষম রোবট নির্মাণে এখন ব্যাপক বিনিয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরাও এই খাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একসময় কল্পবিজ্ঞানের গল্প বা চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ থাকা মানবাকৃতির রোবট এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের গৃহস্থালির সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রোবোস্ট্র্যাটেজির জ্যাক পিয়ারসন মন্তব্য করেছেন যে, ইউনিট্রির এই তালিকাভুক্তি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মানবাকৃতির রোবট কোম্পানিতে বিনিয়োগের একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং এটি পুরো শিল্পের জন্য একটি মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, ইউনিট্রির সাফল্য প্রমাণ করে চীনের রোবটশিল্প এখন 'পরিবর্তনের পর্যায়ে' পৌঁছেছে। এই আশাবাদের মধ্যেই অবশ্য শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে রোবটের ভোক্তা-স্তরের চাহিদা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। বিশ্লেষক হ্যারল্ড সো মনে করেন, গৃহস্থালির কাজে কার্যকরভাবে ব্যবহারোপযোগী হতে রোবটের এখনও বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। ব্যাটারির স্থায়িত্ব, তথ্যের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রাথমিকভাবে কারখানা ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেই রোবটের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হবে। প্রযুক্তি খাতে চীন-মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন রণাঙ্গন হিসেবে দেখা হচ্ছে রোবট ও এআই খাতকে। গত জুলাইয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশীয় উৎপাদন খাতের সুরক্ষার কথা তুলে চীনে নির্মিত নতুন মানবাকৃতির ও চার পায়ের রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করে ট্রাম্প প্রশাসন। বেইজিং এই পদক্ষেপকে বাণিজ্যের 'রাজনৈতিকীকরণ' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর আগে এআই মডেল, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ নানা চীনা প্রযুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের ক্রিস্টিন ওয়ান মনে করেন, রোবটশিল্পে চীনের উত্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশটির কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। তাই ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনের অগ্রযাত্রা থামানো সহজ হবে না। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, চীনা সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা অনেক দেশের উৎপাদনব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, ফলে তারাও চীন থেকে সহজে বিচ্ছিন্ন হতে চাইবে না। এখন পর্যন্ত কারখানা বা ভোক্তাবাজারে পশ্চিমা নির্মাতাদের রোবট চীনা রোবটের মতো প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ রোবট কোম্পানি বোস্টন ডায়নামিকস জানিয়েছে, দুই বছরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাইয়ের কারখানায় তাদের মানবাকৃতির রোবট মোতায়েন করা হবে। অ্যামাজন ও টেসলাও মানবাকৃতির রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে; টেসলা তাদের ক্যালিফোর্নিয়ার কারখানায় অপ্টিমাস রোবট ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, রোবট গবেষক ডেভিড সু-এর মতে, রোবটপ্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্ব হারিয়েছে এবং বর্তমানে প্রযুক্তির খবরে চীনা কোম্পানিগুলোরই আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।