বৈশ্বিক জনমিতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছয়জনে একজন, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৮০ মিলিয়নে পৌঁছাবে। অন্যদিকে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৩ সালে ইইউতে নারীপ্রতি গড় সন্তান জন্মের হার ছিল ১.৩৮, যা ১৯৬১ সালের পর সর্বনিম্ন এবং জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয় ২.১-এর তুলনায় অনেক কম। পর্তুগাল, স্পেন, জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ডে ইতিমধ্যেই জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। অভিবাসন না থাকলে এ ধারা আরও তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বিলিয়নিয়ার ল্যারি এলিসন দীর্ঘদিন ধরেই মৃত্যুকে 'অর্থহীন' বলে মনে করেন। তিনি অক্সফোর্ডে তার নামে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউটে জেনারেটিভ বায়োলজি গবেষণায় কয়েকশ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করেছেন। সেখানকার প্রধান বিজ্ঞানী অর্থনীতির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু স্কট জানান, আজকের জন্ম নেওয়া একটি শিশুর ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। তার মতে, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের প্রায় সব বৃদ্ধিই আসবে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের কাছ থেকে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ৫০ বছর বয়সীদের ৮০ শতাংশ কর্মরত থাকলেও ৬৫ বছর বয়সে তা নেমে আসে ৩০ শতাংশে। তিনি বলেন, 'বয়সজনিত পতনের হার অর্ধেক কমাতে পারলেই জিডিপি ৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব, যা প্রবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে সহজ উপায়।'

ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট জিএসকের চেয়ারম্যান স্যার জোনাথন সাইমন্ডস যুক্তি দেখান, দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার চেয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্যে, 'স্বাস্থ্যকাল' ও 'জীবনকাল'—দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। অলিভার ওয়াইম্যানের এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, একজন মানুষের গড় স্বাস্থ্যব্যয়ের ৮০ শতাংশই ব্যয় হয় জীবনের শেষ ১০ বছরে। তাই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ আগে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে বার্ধক্যকে আর বোঝা হিসেবে দেখা হবে না।

তবে দীর্ঘায়ু অর্থনীতির সুফল সব শ্রেণিতে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। অলিভার ওয়াইম্যান ফোরামের অংশীদার রূপাল কান্তারিয়া সতর্ক করে বলেন, 'উচ্চ-আয়ের গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দমতো প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘায়ু কৌশলে বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে রোগ ও ঋণের বোঝা বাড়ছে। মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীটি উভয় সংকটের মাঝখানে আটকে আছে—একদিকে যেমন সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে, অন্যদিকে নিজেদের অগ্রসর করতেও যথেষ্ট সচ্ছল নয়।'

বার্ধক্যজনিত এই জনমিতিক পরিবর্তন সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কর্মী পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনা ও জীবনধারা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জনমিতিও একটি 'সম্পূর্ণ প্রভাব' ফেলে, যা আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। এই আলোচনায় সব বয়সী অংশ নেওয়া জরুরি—কিশোর থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা, যারা সুস্থ ও উৎপাদনশীল শেষ তিন দশক কাটাতে চান।

এই প্রতিবেদনটি ফরচুন ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারি/মার্চ ২০২৬ ইউরোপ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।