ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমকে চূড়ান্ত করার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে এর আগেই এই আসনের জন্য নিজেদের পছন্দের মুখ হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করে দিয়েছিল এনসিপি। জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে তাদের মধ্যকার জোটগত সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকা-১০ আসন থেকে লড়তে চেয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ভোটে অংশ নেননি। এনসিপির এক শীর্ষ নেতা জানান, আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে জামায়াতের পক্ষ থেকে তখনই আপত্তি ছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে উঠা নানা অভিযোগের কারণে দলটির পক্ষে তাকে সমর্থন দেওয়া সম্ভব নয়। পরে আসিফ আর নির্বাচনে নামেননি। এখন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও যেন একই দৃশ্য পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালে আসিফ মাহমুদের ভূমিকা নেতিবাচক ছিল বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ঠিক কী কী বিষয়, তা স্পষ্ট করেননি এনসিপির ওই নেতা। এনসিপির আরেকজন দায়িত্বশীল সদস্য জানান, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আসিফের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি রয়েছে।

এদিকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া সাদিক কায়েম সম্প্রতি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এনসিপি আপাতত এককভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ, উত্তরসহ পাঁচ সিটির মেয়র পদে এবং ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে তারা। তবে নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষিত হয়নি। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু আপাতত সব দলই নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী করায় মনোযোগী।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলের নেতারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন। মামুনুল হকের দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে থাকলেও সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আসিফ-মামুনুল আলোচনার ভিন্ন তাৎপর্য খুঁজছেন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী আসিফ মাহমুদ মনে করেন, শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো বোঝাপড়া হবে। এটি রাজনৈতিক জোট না হয়ে নির্বাচনী সমঝোতাও হতে পারে। জামায়াত জোটের বাইরে সমঝোতার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব ধরনের সম্ভাবনাই আছে। মামুনুল হকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো এবং দলের অন্যদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত খুব স্পষ্ট নয় যে কার সঙ্গে কী হবে। তফসিল ঘোষণার সময় এগুলো পরিষ্কার হবে বলে তাঁর ধারণা।

সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোট থেকে মাত্র ৩০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৬টিতে জিতেছে এনসিপি। আসিফ মাহমুদ মনে করেন, ২৭০ আসনের বাকি অংশে প্রার্থী না দেওয়ায় তৃণমূল অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অন্তত ৭০ শতাংশ জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্য নিয়েছে এনসিপি।

জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার পর ঢাকা দক্ষিণে আসিফের জন্য জামায়াতের সমর্থন আর থাকছে না। এই বাস্তবতায় আসিফ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করবেন কি না, করলে কীভাবে করবেন, নাকি এনসিপি তাঁকে কুমিল্লা বা অন্য কোনো সিটিতে প্রার্থী করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।