বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে স্পেনের উদযাপন যখন তুঙ্গে, তখনই ভিন্ন এক দৃশ্যে সবার নজর কাড়লেন স্প্যানিশ ফুটবলের সেন্সেসন লামিনে ইয়ামাল। মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে নিরবে দোজা করলেন তিনি। ম্যাচের প্রাক-মুহূর্তেও নিয়মিতভাবে এ একই প্রার্থনা করেন তিনি। তার এ অভ্যাসের মূলে রয়েছেন তার প্রিয়তমা দাদি ফাতিমা নাসরাউই, যাকে কিছু সংবাদমাধ্যমে ফাতিমা রোমানি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস রচনা করেছেন ইয়ামাল। ফাইনালের শেষ বাঁশির পর একদিকে চলছিল স্পেনের বিজয় উল্লাস, অপরদিকে আর্জেন্টিনার হতাশা ও উত্তেজনা। এই বৈপরীত্যের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে ইয়ামালের দোজার ছবিটি স্মরণীয় হয়ে উঠেছে। তার এই আধ্যাত্মিক আচরণের আদেশ আসে পরিবারের অন্যতম অভিভাবক ও শক্তির উৎস হিসেবে পরিচিত ফাতিমার কাছ থেকে।

এক ভিডিওতে ফাতিমা বলেছেন, তিনি তার নাতিকে সব সময় খেলার আগে ও পরে মন থেকে প্রার্থনা করতে বলেন। ইয়ামালও কখনো তার অবহেলা করেননি। ফাতিমার ভাষ্যমতে, ‘আমি ইয়ামালকে বড় করেছি। সে সব সময় আমার কথা শোনে।’ বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচে ইয়ামালের আচরণে তার শিক্ষারই ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

পারিবারিক উত্তম ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে অনেক বছর আগে ফাতিমা একাকী মরক্কো ত্যাগ করে স্পেনে পদার্পণ করেন। ইয়ামালের বরাতে জানা গেছে, তার দাদি বৈধ কাগজপত্র না থাকার পরেও একটি বাসে উঠে আলহেসিরাস ও গ্রানাডা পেরিয়ে কাতালোনিয়ার মাতারোতে পৌঁছান। স্প্যানিশ ভাষার প্রতি অজ্ঞতা সত্ত্বেও নতুন জীবনের শুরুতে চরম কষ্ট স্বীকার করতে হয় তাকে। মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুম থেকে শুরু করে পরিবারকে মরক্কো থেকে নিয়ে আসার জন্য দিনে তিনটি শিফটে পরিচর্যাকারী ও শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন তিনি। সেই সঞ্চিত অর্থে তিনি ইয়ামালের বাবা মুনিরসহ অন্য সন্তানদের মাত্র তিন বছর বয়সে স্পেনে নিয়ে আসেন।

ইয়ামালের যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখন তার পিতামাতার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তার বাবা পুনরায় ফাতিমার সাথে থাকতে শুরু করেন। রোকাফোন্দা এলাকায় বেড়ে ওঠা ইয়ামালের শৈশবকে গড়ে তোলা এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার পেছনে দাদির অসামান্য অবদান ছিল। ফাতিমা জানিয়েছেন, মাঠে নামার আগে তিনি সবসময় নাতিকে সাফল্য ও নিরাপত্তার দোয়ার অনুরোধ করেন। এই অভ্যাসই মাঠে তার একাগ্রতা এবং জয় বা গোলের পর সেজদা করার বিশেষ উদযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তার এই বিশ্বাস দাদি ফাতিমার কাছ থেকেই গড়ে ওঠা।

গোল করার পর আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ দেখান ইয়ামাল। এটি রোকাফোন্দার পোস্টাল কোড ০৮৩০৪-এর শেষ তিন অংক। তার মতে, এই উদ্যাপন রোকাফোন্দা ও তার দাদির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক। দাদির আজীবন ত্যাগ ও কুরবানির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ক্যারিয়ারের প্রথম দিকের বড় আয়ের অংশ দিয়ে রোকাফোন্দায় একটি আধুনিক বাড়ি কিনে দিয়েছেন ইয়ামাল। বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী ও ফটোশুটে প্রায়ই দাদি তার সঙ্গী হন। দাদি-নাতির এমন গভীর সম্পর্ক ফুটবল বিশ্বে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত, যা মনে করিয়ে দেয় পরিবারের বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের আশীর্বাদই সাফল্যের বড় সহায়ক।