রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত সেপ্টেম্বরে একটি নতুন সুবিধা চালু করে। এই সুবিধার আওতায় বন্ড লাইসেন্সের প্রয়োজন ছাড়াই কেবল ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক ও কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দেওয়ায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যার ফলে রপ্তানি প্রত্যাশামাফিক বৃদ্ধি পায়নি এবং সরকারের মূল উদ্দেশ্যটিও সফল হচ্ছে না।
একাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মতে, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির এই পদ্ধতিতে বেশ কিছু নিয়মকানুন কড়া রাখা হয়েছে। এসব জটিলতার কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা এই সুবিধাকে তেমন কার্যকর বলে মনে করছেন না।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পাওয়া সত্ত্বেও সরকার এই সুবিধার পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতকে এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেন। এই খাতগুলোতেও এখন বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কেবল ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে।
গত সেপ্টেম্বরে জারি করা এনবিআরের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় যে, শুল্কমুক্ত এই সুবিধা গ্রহণ করতে হলে কাঁচামাল আমদানিকারককে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর কাস্টমস কর্তৃক নিরূপিত শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে।
ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে জানান, “সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না।” তিনি সুবিধাটি কার্যকর করতে মূল্য সংযোজন পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।”
প্রসঙ্গত, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। এ সময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্যের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তৈরি পোশাক এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমে যায়।
এনবিআরের প্রজ্ঞাপনের নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতিটি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হয়। কমিশনার তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারেন, যার সম্পূর্ণ ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। কমিশনারের অনুমতিপত্র পাওয়ার পর কাঁচামাল আমদানি করা যায় এবং সবশেষে পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হয়।
প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা করেছিল, বন্ড লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় এই সুবিধা রপ্তানিকারকদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং পণ্যের বৈচিত্র্য ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু আসবাব খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, “সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির সুযোগ দেওয়া উচিত। পরবর্তীতে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হলে শাস্তির বিধান রাখা যেতে পারে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই নানা নিয়মের বেড়াজাল তৈরি করায় বাস্তব ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ কোনো কাজে আসছে না।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে এই সুবিধা চালুর পর অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এটি গ্রহণ করেছে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, বিদ্যমান বিধানের আওতায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তা পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ নিশ্চয়ই রয়েছে।




