বাংলাদেশে বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অবস্থান ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইইডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মির্জা এম হাসান। সোমবার সকালে রাজধানীর মহাখালীস্থ ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে তিনি এ পর্যবেক্ষণ দেন।
‘ট্রাজেক্টরি অব নন-ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় মির্জা হাসান বিরোধী দলের দুর্বলতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায়, “আওয়ামী লীগ এখন রাজনীতির অঙ্গনে অনুপস্থিত, জামায়াতে ইসলামী তাদের অবস্থান নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী নয় এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনও অত্যন্ত ক্ষুদ্র।” এসব মিলিয়েই বর্তমান বিরলবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা হাসান নিপীড়নের একটি ‘লঘু সংস্করণ’ দেখা যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে নিপীড়নের কঠিন ও প্রকৃত রূপ দৃশ্যমান হবে। এই ধারা পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত।” উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি ইতিমধ্যেই রাজপথে এনসিপির ওপর হামলা চালাচ্ছে, যার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার লাভ করা শক্তি ও সহিংসতার একটি ব্যাপার, যেখানে এ ধরনের সক্ষমতা ছাড়া কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। বিএনপি, এনসিপি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে তিনি এই অভিগ্রথণেই মূল্যায়ন করেন।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্ককে ‘ওয়েটিং গেম’ হিসেবে বর্ণনা করেন মির্জা হাসান। তিনি বলেন, “জামায়াত চেষ্টা করছে নিজেদের একটি শিষ্ট ও উদার বিরলী দল হিসেবে তুলে ধরতে। তারা খুব বেশি সক্রিয় না হয়ে বরং অপেক্ষা করছে।”
এক অংশগ্রহণকারীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি ‘অ্যাকসেস অর্ডার’ তত্ত্বের কথা টেনে বলেন, ক্ষমতায় থাকা এলিটরা বিপক্ষের এলিটদের সঙ্গে সুবিধা ভাগাভাগি না করার ফলেই টেকসই সংঘাত চলছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেন, “জুলাই সনদ একটি অত্যন্ত এলিট-কেন্দ্রিক, পুরুষ ও বাঙালি মুসলমান-প্রধান প্রক্রিয়া ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল এলিট প্রাধান্য বিস্তারের পরিধি বাড়ানো।”
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মির্জা হাসান তিনটি মডেলের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমটি ‘ডিক্টেরিয়ান কম্পিটিটিভ ডেমোক্রেসি’, যেখানে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু কোনো পলিআর্কি বা মানবাধিকার থাকে না। দ্বিতীয়টি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে নির্বাচনের সাথে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা জড়িত। আর তৃতীয়টি হল ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’ বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি শাসনকাজে অংশ নেন। বাংলাদেশের মতো দেশেও যে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের আলোচনা অকাল নয়, তা জোর দিয়ে বলেন তিনি। ইউরোপ-আমেরিকায় প্রচলিত ‘পলিটিকস উইদাউট পলিটিশিয়ানস’ ধরনের বইয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চান যে, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির মূল্যায়নে মির্জা হাসান বলেন, এটি ছিল রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে সাধারণ মানুষের নেতৃত্বে সরকার ও সংবিধান পরিবর্তনের একটি গণ-আকাঙ্ক্ষা। তবে নতুন যে নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, তা কোনো টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারেনি। ফলে পুরনো রাজনৈতিক শক্তি গুলি আবার সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, বিএনপি সর্তক কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে, জামায়াত মূলধারার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি জোরদারে ব্যস্ত এবং এনসিপি নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার লড়াই করছে।
সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন। মূল প্রবন্ধের পর তিনটি পর্বে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে ‘আনপ্যাকিং ভোটিং বিহেভিয়ার অ্যান্ড ডায়নামিকস’, দ্বিতীয়টিতে ‘পলিটিশিয়ানস অ্যান্ড পলিটিক্যাল পার্টিস: ওল্ড কোয়েশ্চেনস অ্যান্ড নিউ ডায়নামিকস’ এবং শেষ পর্বে ‘ফিউচার অব ডেমোক্রেসি’ নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, আইনজীবী সারা হোসেনসহ সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।




