ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার নয় দিন পর ফিফা একটি বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ ঘোষণা করেছে, যা এখন গোটা ইউরোপীয় ফুটবল জগৎকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (এফএফই) নামের এই পরিকল্পনার আওতায় ফিফা একটি সহায়ক সংস্থা গঠন করবে, যার মূল্য ধরা হয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। ফিফার নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সংস্থায় বাইরের বিনিয়োগকারীদের সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব বিক্রি করে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিনিময়ে ফিফার ২১১টি সদস্য সংস্থার প্রত্যেককে ৪০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জোশুয়া কুশনার প্রতিষ্ঠিত থ্রাইভ ক্যাপিটাল এই বিনিয়োগকারী গ্রুপের নেতৃত্ব দেবে বলে জানা গেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমান বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলো নিরাপত্তা, পরিবহন ও স্টেডিয়াম সংস্কারের মতো বিপুল ব্যয় বহন করলেও টিকিট, স্পনসরশিপ ও মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত আয় পুরোপুরি ফিফার কাছে চলে গেছে। ফরচুন ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কাঠামোর মাধ্যমেই ফিফা তার বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে ফিফার রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৯ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্বাভাস ১১ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩-২৬ চক্রে ক্লাব বিশ্বকাপ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার মোট রাজস্ব ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এই পরিকল্পনাকে 'ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শাসন' বলে অভিহিত করেছে। উয়েফার অভিযোগ, ফিফা সদস্যদের যথাযথ পর্যালোচনার সময় না দিয়েই ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, যা আর্থিকভাবে সংকটে থাকা ছোট ফেডারেশনগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করা হলে তার সদস্য দেশগুলো পুরুষ ও নারী উভয় বিশ্বকাপই বয়কট করবে। উয়েফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'যতদিন ইউরোপের কণ্ঠস্বর আছে, ততদিন তা কখনো বিক্রি হবে না।'
শুধু উয়েফাই নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এই উদ্যোগকে 'যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব' বলে সমালোচনা করেছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করায় 'হতাশা' প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়া কমিশনার গ্লেন মিকালেফ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, 'আমাদের খেলা থেকে হাত সরিয়ে নিন।' ফিফার সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কোর্ডেইরো এই পরিকল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন, একে 'সদস্য সংস্থা, ফুটবল ও খেলার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য খারাপ চুক্তি' বলে অভিহিত করেছেন।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনাকে 'সুযোগ, বাধ্যবাধকতা নয়' বলে রক্ষা করেছেন। ফিফা দাবি করছে, 'কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না' এবং এই বিতর্কের জন্য 'ভুল প্রতিবেদন' দায়ী। তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রস্তাবটি গ্রহণের জন্য ৭৫ শতাংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, কিন্তু আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ায় ছোট ফেডারেশনগুলোর পক্ষে নীতির প্রশ্নে তা প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইনফান্তিনো প্রথমে ২০ মিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করলেও প্রতিক্রিয়া দেখে এক দিনের মধ্যে তা দ্বিগুণ করে ৪০ মিলিয়ন ডলার করেন। থ্রাইভ ক্যাপিটালের জোশুয়া কুশনার এর আগে ওপেনএআই-তে বড় বিনিয়োগ করে সফল হয়েছেন, যা ফিফার এই নতুন উদ্যোগের কৌশলের সঙ্গে মিল রয়েছে।




