আদিম মানবের প্রথম হাতিয়ার সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিচ্ছে নতুন এক গবেষণা। ২০০১: আ স্পেস ওডিসি সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্যের মতো নয়—যেখানে একটি লম্বা হাড়কে অস্ত্র হিসেবে দেখানো হয়—বাস্তবে আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার হতে পারে একটি সাধারণ পাত্র। মার্ক কিসেল নামে অ্যাপালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটির প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজিস্ট এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা চালিয়েছেন।
কিসেল ও তাঁর দল প্রাগৈতিহাসিক পাত্রের একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি করেছেন, যেখানে লাখ লাখ বছর পুরোনো কয়েক শ নমুনা রয়েছে। তাদের মতে, পাত্র বলতে এমন যেকোনো জিনিস বোঝায় যার ভেতরে কিছু রাখা যায়, বাইরের জগৎ থেকে আলাদা করা যায় এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বহন করা সম্ভব হয়। এই সংজ্ঞায় চামচ, প্রদীপ, সুচ রাখার খাপ, এমনকি পানি বহনের কাজে ব্যবহৃত উটপাখির ডিমও পাত্র হিসেবে গণ্য হয়।
এখন পর্যন্ত ৭৩৯টি ভ্রাম্যমাণ পাত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনটি জাম্বিয়ার কালাম্বো ফলস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গাছের ছাল দিয়ে তৈরি এই থালাটির বয়স আনুমানিক চার থেকে পাঁচ লাখ বছর। আগে ধারণা করা হতো, কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর মাত্র ১০ হাজার বছর আগে পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু এই আবিষ্কার সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।
ডেটাবেসের প্রায় ৮৭.৮ শতাংশ পাত্র ইউরোপে পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পাত্রের ব্যবহার ইউরোপেই প্রথম শুরু হয়েছিল; বরং ইউরোপে বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ হওয়ায় সেখানে বেশি নমুনা মিলেছে। কাঠ বা লতাপাতার মতো পচনশীল উপাদানের তৈরি পাত্রগুলো হয়তো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
শিম্পাঞ্জি বা অন্য প্রাইমেটরা পাতা দিয়ে পানি শুষে খেলেও তারা কখনো পাত্র তৈরি করতে পারে না। এখানেই মানুষের সঙ্গে তাদের মৌলিক পার্থক্য। কিসেলের মতে, পাত্র ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন উদ্দেশ্য হতে পারে শিশুদের বহন করা। মানুষের শরীরে শিম্পাঞ্জির মতো ঘন লোম না থাকায় এবং সোজা হয়ে হাঁটার কারণে শিশুদের বহন করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অস্ট্রালোপিথেকাসের মতো আদিম মানবেরা হয়তো এই সমস্যা সমাধানে প্রথম ঝুড়ি বা পাত্র তৈরি করেছিল।
১৯৭৬ সালে নৃবিজ্ঞানী ন্যান্সি ট্যানার ও অ্যাড্রিয়েন জিলম্যান প্রথম এই ধারণা দেন যে আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার ঝুড়ি হতে পারে, যা দিয়ে নারীরা খাবার সংগ্রহ করতেন। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখিকা উরসুলা কে লে গুইন তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ইতিহাসে শিকার ও যুদ্ধের গল্পের প্রাধান্য থাকলেও বেঁচে থাকার জন্য খাবার সংগ্রহ ও সংরক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খারাপ আবহাওয়ার দিনে পাত্রে জমানো খাবারই মানুষকে টিকিয়ে রেখেছিল।
গবেষকদের মতে, মানবজাতির টিকে থাকার মূল রহস্য আগ্রাসন বা বুদ্ধিমত্তার চেয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মধ্যে নিহিত। এই সহযোগিতার বড় প্রমাণ হলো সেই সাধারণ পাত্র, যা দিয়ে হয়তো কোনো আদিম মানুষ নিজের জমানো খাবার বিপদে পড়া সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। মানুষের ইতিহাস তাই শুধু অস্ত্রের নয়, বরং একটি সাদামাটা পাত্রেরও হতে পারে।

