বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত বলে মনে করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। কানাডা ও ফ্রান্সের মতো মার্কিন মিত্ররা ডলারের অত্যধিক ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ করছে, অপরদিকে ইরানের মতো প্রতিপক্ষরা ক্রিপ্টোকারেন্সি ও চীনা ইউয়ানে লেনদেন শুরু করায় অনেকে মনে করছেন বিশ্ব ধীরে ধীরে ডলার থেকে সরে যাচ্ছে। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অর্থনীতির বিশ্লেষকরা এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। ব্যাংকটির এশিয়ান ও দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা গবেষণার সহ-প্রধান দিব্যা দেবেশ সিঙ্গাপুরের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'আমরা সত্যিই এই ডি-ডলারাইজেশন তত্ত্বে বিশ্বাসী নই।' তার মতে, বরং বাস্তবে ঘটছে 'রি-ডলারাইজেশন' অর্থাৎ কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা এখনও ডলারকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন।

বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ১৯৯৯ সালে যেখানে ৭১ শতাংশ ছিল, সেটি ২০২৪ সালে এসে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে— যা এক চতুর্থাংশের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু দিব্যা দেবেশ এই পতনকে ডলারের প্রতি আস্থাহীনতা হিসেবে দেখছেন না। তিনি তাইওয়ানের উদাহরণ টেনে বলেন, দেশটির রপ্তানি আয়ের প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে মাত্র ২ ডলার নিউ তাইওয়ান ডলারে রূপান্তরিত হয়; বাকি মূলত ডলার হিসেবেই রাখা হয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় ১০০ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে এনেছে, চীনের পিপলস ব্যাংকও টানা কয়েক মাস ধরে সোনার মজুদ বাড়াচ্ছে—এসব পদক্ষেপকে ডলার থেকে ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অর্থনীতিবিদরা যুক্তি দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যান্য দেশও একই ধরনের রাজস্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা করছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের বোঝা, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক ব্যবহারের নীতি এবং ডলারবহির্ভূত বাণিজ্য ডলারের মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান গবেষণা কৌশলবিদ এরিক রবার্টসেন বলেছেন, 'ট্রাম্প, টুইন ডেফিসিট বা মার্কিন বাজেটের গতিপথ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকতে পারে। কিন্তু যদি কেউ ডলার বিক্রি করে, তবে তাকে অন্য কিছু কিনতে হবে—এবং বিকল্পগুলো খুব বেশি আকর্ষণীয় নয়।' তিনি বাজেট ঘাটতিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের পরিবর্তে বন্ড বাজারের মাধ্যমে ফিল্টার হওয়ার কথা বলেন। তার মতে, ঘাটতির কারণে ডলার অদূর বা মধ্যমেয়াদে নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা হারাবে না।

গত বছর শুল্ক ঘোষণার পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ডলার বিক্রি বা বৈদেশিক মুদ্রা হেজিং দেখা গিয়েছিল, বিশেষ করে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কিন্তু রবার্টসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন সুদের হার না কাটানোয় ফেডারেল রিজার্ভ এবং মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ডলারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনছে। মার্কিন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) খাতেই নয়, পুরো অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দিব্যা দেবেশের মতে, উচ্চ উৎপাদনশীলতা উন্নত আয়ের দিকে নিয়ে যায় এবং তা পুঁজি প্রবাহ বৃদ্ধি করে ডলারকে শক্তিশালী রাখে। বিদেশিদের কাছ থেকে মার্কিন সম্পদের চাহিদাও এখনও খুব জোরালো বলেই তিনি মনে করেন।