দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর প্রকৃত সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ হলেও হামের টিকার জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ। অর্থাৎ, প্রায় ৪৬ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। এর ফলশ্রুতিতে ৪২ লাখেরও বেশি শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি, যা মহামারি নিয়ন্ত্রণে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই পর্যন্ত হামের টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৯ জন শিশু। এই সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি হলেও প্রকৃত শিশু সংখ্যার তুলনায় এটি মাত্র ৮১ শতাংশ। বাকি ১৮ শতাংশ শিশু হামের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনে একই বয়সসীমার ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুকে ইতিমধ্যে ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে প্রকৃতপক্ষে এই বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখের কাছাকাছি।
এ বিষয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদ জানান, ক্যাম্পেইনের শুরুতে কেবল ৩০টি উপজেলায় টিকা দেওয়া হয়, যেখানে শিশুর সংখ্যা ছিল অনুমিত। পরবর্তী ধাপগুলোতে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তিনি স্বীকার করেন যে তাদের পরিসংখ্যান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের সাথে মিলে গেলেও সংখ্যার পার্থক্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির পরিচালক মো. ইউনূস আলী জানান, তারা জেলার সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন, যেখানে শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখই দেখা গেছে।
বাগেরহাটের এক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য মাইক্রোপ্ল্যানিং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছিল, যার ফলে কিছু শিশু বাদ পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, এখনও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ সব শিশু টিকা না পাওয়া। তিনি ৪৬ লাখ সংখ্যাটিকে অত্যন্ত বড় ও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, এই বিপুল পার্থক্যই প্রমাণ করে যে হামের এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেননি। তার মতে, পুরো ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত।
এদিকে, গত শনিবার স্বাস্থ্য বিভাগ আরও তিনটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে, যার ফলে চলতি বছরের মার্চ থেকে হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫৩ জন। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সরকার এপ্রিল মাসে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকার মাধ্যমে ক্যাম্পেইন শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী সব এলাকায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। তবে ২৮ জুন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন শুরু হলে একই বয়সী শিশুর সংখ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইপিআইয়ের সাবেক উপপরিচালক তাজুল এ বারি জানান, ২০১০ সালের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের সময়ও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ, কিন্তু তখন বয়সসীমা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর। বর্তমানে বয়সসীমা কমিয়ে ৬ মাস করা হওয়ায় শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ারই কথা ছিল। এই বিভ্রান্তির কারণে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সরকারকে দ্রুত এই ৪২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যথায় হামের প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।




