মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর ব্যাপারে একটি চুক্তি আসন্ন। বুধবার ক্যালিফোর্নিয়া সফররত অবস্থায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, আগামীকাল অথবা তার পরের দিনই এই চুক্তি ঘোষিত হতে পারে। তার ভাষায়, ‘অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’ এর আগে অ্যাক্সিওস ওয়েবসাইটের একটি প্রতিবেদনে বুধবার এ সংক্রান্ত ঘোষণার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পায়, তবে পরে আবার সামান্য বাড়ে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে স্থিতিশীল ছিল, যা সংঘাতের উচ্চতায় যে স্তরে পৌঁছেছিল তার চেয়ে অনেক নিচে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল তেহরানের সরকার উৎখাত ও পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। কিন্তু ইরানের হুমকি ও হামলার কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ায় সংঘাত প্রণালী নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে রূপ নেয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হতো এবং বন্ধ থাকায় জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৈশ্বিকভাবে বেড়ে যায়। ট্রাম্পের ওপরও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে।

আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানি ও ওমানি আলোচকরা হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত করেছেন। তারা বুধবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। কর্মকর্তাদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিবাদের একটি অস্থায়ী সমাধান, যা গত জুনে পৌঁছানো চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল। তারা বলেন, সম্ভাব্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার পথ সুগম করবে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী জাহাজগুলো ইরান নিয়ন্ত্রিত পথে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করবে এবং ওমান নিয়ন্ত্রিত পথে বের হবে। নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সেবা ফি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, যদিও ওমান ও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করেনি। ট্রাম্প ফি আদায়ের বিষয়ে তার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমি তাদের চার্জ করতে দেব না।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মঙ্গলবার বলেন, তেহরানের ওমানের সঙ্গে আলোচনা নিরাপদ আগমন ও প্রস্থান রুট প্রতিষ্ঠা এবং সার্বভৌম অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিকে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনায় অগ্রগতি স্বীকার করলেও বলেন, এখনো চূড়ান্ত নয়। গত মাসে তিনি ইরানের হাতে প্রণালী দেওয়ার যে কোনো চুক্তি নাকচ করে দিয়েছিলেন, এটিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

চুক্তির আশা বাড়লেও অঞ্চলে জাহাজে হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীরা বুধবার সৌদি তেল ট্যাংকার ‘ওয়াফা’র দিকে রেড সাগরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছে। তাদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি জানান, ইয়ানবু বন্দরের কাছে জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সৌদি আরব থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য আসেনি। এই হামলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ পুনরায় উসকে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। জুলাই মাসে হুতিরা সৌদি পণ্যের জন্য বাব এল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করে। মঙ্গলবার ভারতীয় পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ বিস্ফোরক বোঝাই নৌকার আঘাতে রেড সাগরে ডুবে যায়; দায় স্বীকার করেনি কেউ। একইদিন হরমুজ প্রণালীতে ওমানের বন্দর আল খাসাবের কাছে একটি কার্গো জাহাজ ‘অজানা প্রজেক্টাইলের’ আঘাতের শিকার হয়েছে বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে।

পৃথকভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক ইরানে মার্চ থেকে মৃত্যুদণ্ড ও ফাঁসি বেড়ে যাওয়ার সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ভয় দেখানো ও মতবিরোধ দমনে ফাঁসি ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯ মার্চ থেকে অন্তত ৫৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ জন সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আরও ১০০ জনেরও বেশি একই ধরনের অভিযোগে ফাঁসির ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি ন্যায়বিচার ও প্রক্রিয়ার অভাবকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় এবং গ্রেপ্তারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকরের ঘটনা ঘটেছে।