বিশ্ব চলচ্চিত্র ও মার্শাল আর্টের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ব্রুস লি। কিন্তু মাত্র ৩২ বছর বয়সেই তার আকস্মিক মৃত্যু আজও এক গভীর রহস্যে মোড়া। ১৯৭৩ সালের এই দিনে তার মৃত্যু ঘটে, তবে কি ছিল সেই অকাল প্রয়াণের মূল কারণ, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। মৃত্যুর পরপরই মুক্তি পাওয়া ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ সিনেমাটি তার স্বপ্ন পূরণ করলেও, তাকে আর তা দেখে যেতে পারেননি।

১৯৭৩ সালের জুলাই মাস ছিল ব্রুস লির জন্য অত্যন্ত ব্যস্ততার। ‘গেম অব ডেথ’-সহ একাধিক নতুন ছবির কাজ চলছিল। ২০ জুলাই সেদিন হংকংয়ে সকালে অনুশীলন শেষে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সিনেমা সংশ্লিষ্ট নানা কাজ সারেন তিনি। পরে এক সহ-অভিনেত্রীর বাসায় গিয়ে ছবির কাজ নিয়ে আলাপ করেন। সেখানেই প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হওয়ায় একটি ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করে বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়েন। কিন্তু আর জাগেননি তিনি।

জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও ব্রুস লির শিকড় ছিল হংকংয়ে। ক্যান্টনিজ অপেরার শিল্পী পিতার হাত ধরে মাত্র ছয় বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। ১৮ বছর পূর্ণ হবার আগেই ২০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ‘খুদে ড্রাগন’ নামে পরিচিতি পেয়ে যান। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন হংকংয়ের রাস্তায় মারামারি করে বেড়ানো এক উদ্ধত কিশোর। এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই আত্মরক্ষার প্রয়োজনে উইং-চুন শৈলীর কুংফুর প্রশিক্ষণ শুরু করেন তিনি, যা পরে তার জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুলে পড়ার সময় এক অভিজ্ঞ শিক্ষককে বক্সিং রিংয়ে পরাস্ত করে তিনি সবার নজরে আসেন। এ সময়ে নৃত্যও তার মার্শাল আর্টের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভূত হয়ে যায়; কিশোর বয়সে হংকংয়ে তিনি হয়ে ওঠেন চা-চা নৃত্যে চ্যাম্পিয়ন। পরে রাস্তার এক মারামারির ঘটনায় গ্রেপ্তার হলে পরিবার তাকে পাঠিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রে, যা ছিল ব্রুসের জীবনে এক অনিচ্ছাকৃত নির্বাসন। সিয়াটলে চরম অর্থকষ্টের মধ্যে কুং শেখানো শুরু করেন এবং সেখানেই প্রিয় শিক্ষার্থী লিন্ডা এমেরির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই সময়ে কুংফু, বক্সিং ও বাস্তব স্ট্রিট ফাইটের মিশ্রণে তিনি তৈরি করেন নতুন মার্শাল আর্টের ধারা ‘জিৎ কুনে দো’।

হলিউড তারকাদের প্রশিক্ষক হিসেবে সুনাম কড়ালেও এশিয়ান হওয়ার কারণে অভিনয়ে ছিলেন অবহেলিত। এই অভিমান থেকেই 1970 সালের শেষ দিকে তিনি ফিরে আসেন হংকংয়ে। প্রযোজক রেমন্ড চৌয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তিনি গড়ে তোলেন কুংফুভিত্তিক চলচ্চিত্রের নতুন অধ্যায়। 1971-এর ‘দ্য বিগ বস’ এবং পরের বছর ‘ফিস্ট অব ফিউরি’ হংকংয়ে আয়ের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ব্রুস লিকে এশীয় অ্যাকশন তারকার প্রতিকে পরিণত করে। তিনিই প্রথম এশীয় অভিনেতা, যাঁর চলচ্চিত্রমূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে মিলিয়ন ডলার পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল।

কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রমের চাপ আর অনিদ্রার মাশুলও দিতে হয়েছিল তাকে। ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ ছবির ডাবিং চলাকালে 1973 সালের মে মাসে একবার সেরিব্রাল এডিমা বা মস্তিষ্কে ফুলে যাওয়ার কারণে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসায় সে যাত্রা বে গেলেও দুই মাস পর 20 জুলাই হংকংয়ে একই রকম উপসর্গ নিয়ে তিনি চিরঘুমে আচ্ছন্ন হন। মার্কিন জীবনীকার ম্যাথিউ এ পলি তার গ্রন্থে লেখেন, মাথাব্যথা কামতে ব্রুস লি ‘একুয়াজেসিক’ নামক এক ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েছিলেন, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সেরিব্রাল এডিমা হতে পারে। কেউ গাঁজার উপস্থিতির ভূমিকা সন লাগ করলেও ফরেনসিক বিশষজ্ঞ তা নাকচ করেন। পলি আরও উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত পরিশ্রম ও হিট স্ট্রোকের কারণেও এডিমা হতে পারে, কেননা 1972 সালেই ব্রু লির বগলের ঘর্মগ্রন্থি অপসারণ করা হয়েছিল।

তবে 2022 সালে ‘ক্লিনিক্যাল কিডনি জার্নাল’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় চকিত তথ্য সামনে আসে। স্পেনের কিডনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি পানের ফলে কিডনি তা পরিশোধন করতে না পেরে মস্তিষ্কে সেরিব্রাল এডিমা সৃষ্টি হয়েছিল, যা তার মৃত্যুর কারণ। মৃত্যু নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা এই জল্পনার বিপরীতে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অমলিন। তিনি মার্শাল আর্টকে নিছক লড়াই নয়, বরং আত্ম-অন্বেষণ ও প্রতিবাদের এক অনন্য ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। পশ্চিমা আধিপত্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকেই বানিয়ে ছিলেন প্রতিরোধের মাধ্যম, যা বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের স্বীকৃতিও তাকে এনে দেয়।