দেশের ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে সংগঠনটিতে কোনো নির্বাচিত নেতৃত্ব নেই, এবং সর্বশেষ দুই সপ্তাহ ধরে একজন প্রশাসকও নেই। গত মাসের শেষ সপ্তাহে বিদায়ী প্রশাসকের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগের দাবি ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করলে, ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সংগঠনের পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। হাফিজুর রহমান এক বছর দায়িত্বে থাকলেও নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারেননি। তার আমলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলেও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার বিভিন্ন ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন ব্যবসায়ী আদালতে রিট করায় ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়।
হাফিজুর রহমানের মেয়াদ শেষে দেড় মাস প্রশাসক পদ ফাঁকা থাকার পর গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে ১২০ দিনের জন্য প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। মামলা জটিলতার কারণে তিনিও নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে তার মেয়াদ আরও চার মাস বাড়ানো হয়, যা গত ২৬ জুন শেষ হয়। ওইদিন শেষবারের মতো অফিস করেন আবদুর রহিম খান, যিনি বর্তমানে শ্রম মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। তিনি জানান, তার মেয়াদকালে একজন ব্যবসায়ীকে প্রশাসক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের প্রক্রিয়াও স্থবির হয়ে আছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের মে মাসে নতুন বিধিমালা জারি করা হয়। এতে টানা দুবারের বেশি পরিচালনা পর্ষদে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সর্বশেষ দুই পর্ষদের সদস্যরা নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হন। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে আইনি পদক্ষেপ নিলে নির্বাচনপ্রক্রিয়া থমকে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও, গত সেপ্টেম্বরে এক দফা বৈঠকের পর প্রক্রিয়াটি আর এগোয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরও পাঁচ মাসে এ সংশোধন সম্পন্ন হয়নি, যার ফলে এফবিসিসিআই ছাড়াও ঢাকা চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি চেম্বারের নির্বাচন আটকে আছে।
ব্যবসায়ী নেতারা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহায়ক কমিটির সদস্য আবুল কাশেম হায়দার মন্তব্য করেন, সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বললেও প্রায় দুই বছর ধরে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনে কোনো নেতৃত্ব নেই। তিনি অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার আলোচনার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার যদি প্রয়োজন মনে না করে তবে এফবিসিসিআই বিলুপ্ত করে দিক। সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনের অভিমত, যত দ্রুত সম্ভব শীর্ষ সংগঠনটিকে সচল করা জরুরি, নতুবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাদের সমস্যা সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারবেন না।
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানিয়েছেন, বেসরকারি খাত থেকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক নিয়োগের জন্য একজন যোগ্য ব্যবসায়ী খোঁজা হচ্ছে এবং তার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে কবে নাগাদ এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।




