অ্যাকশন সিনেমা মানেই যেন ধারাবাহিক লড়াই, আর সেটাই পূর্ণ মাত্রায় উপস্থাপন করেছে নতুন মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘দ্য ফিউরিয়াস’। যারা মনে করেন সম্প্রতি তেমন কোনো ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছবি চোখে পড়েনি, তাদের জন্য এই সিনেমা হতে পারে দারুণ এক উপহার। ছবিটির গল্প অবশ্য নতুন কিছু নয়; অপহৃত এক কন্যাকে উদ্ধার করতে বাবার জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের এই কাহিনি অনেকবার দেখা। তবে পরিচালক কেনজি তানিগাকি এখানে গল্প বলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অ্যাকশনের ওপর। প্রায় ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিটের এই ছবিতে এমন পাঁচ মিনিটও নেই যখন পর্দায় কোনো না কোনো লড়াই চলছে না।

মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন শি মিয়াও, যিনি ওয়াং ওয়ে নামে এক বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভূমিকায় রয়েছেন। তার মেয়েকে অপহরণ করা হয় এবং তাকে উদ্ধার করতেই তিনি নেমে পড়েন একের পর এক সংঘর্ষে। লিয়াম নিসনের ‘টেকেন’ সিনেমার মতো কাঠামো থাকলেও পরিচালক সেটিকে নিছক অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সংলাপের পরিবর্তে পুরো ছবি জুড়ে তিনি দর্শকদের অ্যাকশনের জাদুতে বুঁদ করে রাখার চেষ্টা করেছেন, যা অনেকাংশেই সফল।

অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ধাপে ধাপে আরও তীব্র ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। শুরুতে ট্রাকের ভেতরে এবং চারপাশে জ্যাকি চ্যান ঘরানার কুংফু লড়াই দেখা যায়, যেখানে স্টান্টগুলো কৌশলনির্ভর। কিন্তু সময় যত এগোয়, সংঘর্ষগুলো আরও নির্মম ও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। সাউন্ড ডিজাইন এতটাই নিখুঁত যে প্রতিটি ঘুষি-লাথির আঘাত যেন নিজের শরীরে লাগে। ক্যামেরার কাজও প্রশংসনীয়; গতিশীল ক্যামেরা প্রতিটি লড়াইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ইলেকট্রনিক সংগীত পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও তীব্র করে তোলে।

‘দ্য ফিউরিয়াস’ শুধু বাস্তবধর্মী অ্যাকশনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত হয়ে ওঠে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসে একটি শিশুর দুর্বৃত্তদের ওপর হামলার মতো দৃশ্য বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে গেলেও নির্মাতারা রসবোধের সঙ্গেই তা উপস্থাপন করেছেন। এটি হংকং অ্যাকশন সিনেমার ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি বলেও মনে হয়।

তবে ছবির আবেগঘন অংশগুলো সব সময় সমান কার্যকর নয়। সাংবাদিক নাভিন (জো তসলিম) চরিত্রের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বা শিশুদের ঘিরে নাটকীয় দৃশ্যগুলো মাঝে মাঝে গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। কিন্তু নির্মাতারা দ্রুতই আবার অ্যাকশনে ফিরে আসেন, যা দেখতেই দর্শকরা হলে যান।

ছবির সবচেয়ে স্মরণীয় অংশগুলোর একটি হলো মাঝামাঝি সময়ের গুদামঘরের লড়াই। সেখানে ব্রায়ান লে-র অভিনীত হো চরিত্রটি বিশাল এক স্লেজহ্যামার নিয়ে হাজির হন। তার উপস্থিতি যেমন ভয়ংকর, তেমনি আকর্ষণীয়। এই লড়াইয়ে হাতুড়িটি এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রের হাতে ঘুরে বেড়ায়, চারদিকে রক্ত আর ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়। এমনকি বরফের ভাস্কর্যও হাতুড়ির আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। দৃশ্যগুলো এতটাই উন্মত্ত যে মনে হয় সিনেমা আসলে এমনই হওয়া উচিত।

ক্লাইম্যাক্সের পুলিশ স্টেশনের দীর্ঘ অ্যাকশন সিকোয়েন্সটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উশু, জুডো-সহ নানা ধরনের মার্শাল আর্ট একসঙ্গে মিশে তৈরি করে অবিশ্বাস্য এক লড়াই, যা ‘দ্য রেইড’ ফ্র্যাঞ্চাইজির কথাও মনে করিয়ে দেয়। দ্বিমুখী, ত্রিমুখী ও চতুর্মুখী অ্যাকশন দৃশ্যটি শুধু রক্তাক্ত নয়, একইসঙ্গে দারুণ সৃজনশীল।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে ছবিটি অসাধারণ। নির্মাতা কেবল সহিংসতার ওপর নির্ভর না করে অ্যাথলেটিক দক্ষতা, নিখুঁত কোরিওগ্রাফি এবং চমকপ্রদ ভিজুয়ালের মাধ্যমে অ্যাকশনকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছেন। ‘দ্য ফিউরিয়াস’ হংকংয়ের অসংখ্য ক্লাসিক মার্শাল আর্ট ছবির প্রভাব বহন করলেও নিছক অনুকরণে আটকে নেই। কেনজি তানিগাকি নিজের স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীতে এমন এক অ্যাকশন চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে আসন ছেড়ে ওঠার সুযোগ দেয় না। তবে একটি সতর্কতা—এক বসায় সিনেমাটি দেখার পর ঘোর কাটাতে কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন হবে।