১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের (২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭—১২ আগস্ট, ২০০৪) নিবন্ধ ‘যেভাবে লেখা হলো নারী’। আজ তাঁর প্রয়াণদিবস উপলক্ষে অন্য আলো অনলাইনে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হলো সেই লেখা।
আজাদ জানান, কলাম লেখার এক ক্লান্তিকর সময়ে তিনি বুঝতে পারেন নিজেকে অপচয় করছেন। নষ্ট রাজনীতির বিষয়ে লিখতে গিয়ে বমি পাচ্ছিল তাঁর। ১৯৮৯ সালে লেখা একটি কলাম—‘নারী ও মৌলবাদী-মার্ক্সবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা’—পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নারী’র বীজ বপন করে। তবে বইটি তৎক্ষণাৎ জন্ম নেয়নি। মোজাম্মেল বাবু তাঁকে পরামর্শ দেন, কলাম না লিখে নারী বিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করতে পারেন। সেই ঝিলিকেই তিনি নারীবাদে তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহের কথা স্মরণ করেন।
অনার্সের দিন থেকেই নারীবাদে উৎসাহী ছিলেন আজাদ। ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে সিমোন দ্য বোভোয়ারের ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ ও বেটি ফ্রাইডানের ‘ফেমিনিন মিস্টিক’ কিনেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে কেইট মিলেটের ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’, গ্রিয়ারের লেখা এবং মরোক্কোর ফাতেমা মেরনিসি ও মিসরের নওয়াল সাদাওয়ির বই সংগ্রহ করেন। কয়েক মাসে প্রায় চল্লিশ হাজার পাতা পড়েন। মিলেটের বইটি তাঁর কাছে পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ংকর মনে হয়; প্রতিটি পঙ্ক্তি ছিল তেজস্ক্রিয়। ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে কাঁপতে বইটি শেষ করেন তিনি। তখন বুঝতে পারেন, তাঁর ভেতরের অস্পষ্ট ধারণাগুলোকে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন মিলেট। তাঁর বিশ্বদৃষ্টিই বদলে যায়।
এরপর তিনি পড়েন বাইবেল, কোরান, মনুসংহিতা, মহাভারত, প্লাতো, অ্যারিস্টটল, রুশো, রাসকিন, এঙ্গেলস, টেনিসন, রবীন্দ্রনাথ, ফ্রয়েডসহ অজস্র গ্রন্থ। যেগুলোকে একসময় ধ্রুব সত্য মনে করতেন, সেগুলোতে দেখেন চিন্তার দীনতা ও শ্রেণিস্বার্থ। রবীন্দ্রনাথ ও রুশোকে নতুন চোখে দেখেন; বুঝতে পারেন, তাঁরা মুক্তিদাতা নন, বরং তাঁদের ভেতরে জড়ো হয়ে আছে বহু বাজে বস্তু। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্টের ‘ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওমেন’ খুঁজে পেয়ে বিস্মিত হন; দুই শতাব্দী আগে এক তরুণীর লেখা সেই বই তাঁর কাছে অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দুর সমাহার মনে হয়।
বইটি লেখার আগে আজাদ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন। গদ্যকে বিশ্লেষণ ও শিল্পসৃষ্টির যুগপৎ মাধ্যম করতে চান। বুঝতে পারেন, বাংলায় এই বিষয়ে আর বছর বছর বই লেখা হবে না, তাই একটি মহাগ্রন্থই যথেষ্ট। শুধু পশ্চিমা তত্ত্ব নয়, এই অন্ধকার অঞ্চলের—বাংলার—অন্ধকার ও জ্যোত্স্নাও খুঁজে বের করতে হবে। দেখতে পান, অন্ধকারই ছড়ানো; আলো জ্বলছেন কেবল রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও রোকেয়ার মধ্যে।
লেখার শ্রম ছিল খনিশ্রমিকের চেয়েও বেশি। তবে একটি সাম্প্রতিক বিস্ময়—অ্যাপল ম্যাকিনটোশ প্লাস—তাঁকে উদ্ধার করে। ১৯৭৩ সাল থেকেই হাতের লেখা ছেড়েছেন তিনি। আগে ছিল একটি মুনীর অপটিমা টাইপরাইটার, যা তাঁর হৃদপিণ্ডকে পীড়িত করত। ম্যাকিনটোশ প্লাস ছিল কল্পনার চেয়েও কল্পনাপ্রবণ; যা করতে চাইতেন, তার চেয়েও বেশি করতে পারত। হাতে লিখলে কয়েক বছর লাগত, পাতার পর পাতা নোটে ভরে যেত। কিন্তু কম্পিউটারে নোট ও উদ্ধৃতি সাজিয়ে রেখে সহজে কপি-পেস্ট করে লেখায় যুক্ত করতে পারেন। টাইপরাইটার ও কম্পিউটারে লেখার অভ্যাস থাকায় কলমে ভাবনাগুলো সৃশৃঙ্খলভাবে আসে না তাঁর। সংশোধন বহুবার করেন; কম্পিউটারই তা অবলীলায় দেয়। তাই ম্যাকিনটোশ প্লাসের নামেই একটি বই উৎসর্গ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
প্রথমে ধীরে ধীরে লিখছিলেন, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস-এ ধারাবাহিক বেরোচ্ছিল। পরে বুঝতে পারেন ধীরগতিতে চলবে না। দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা—এমনকি রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে উঠে মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে সিগারেট ও চায়ের সঙ্গে লেখায় বসতেন। আজ তিনি তা করতে পারবেন না বলে মনে করেন; প্রত্যেক মানুষ বিশেষ সময়ে বিশেষ কাজ করতে পারে। ১৯৮০ বা ১৯৯০ সালের আজাদ তা পারতেন না; আজ যা পারেন, তা তখন পারতেন না।
অধ্যায়ের নামগুলো—যেমন ‘নষ্টনীড়’—অবলীলায় মনে এসেছিল। নারীর স্রাবের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের অনশ্বর গল্পের চিত্রকল্প মনে পড়ে। এই পরিচ্ছেদে চিকিৎসা পরিভাষা এড়িয়ে কবিতার কাছাকাছি আসতে চেয়েছিলেন। নারীর শরীরের বিস্তৃত বর্ণনা দেন, কারণ নারীরা নিজেদের শরীরকে সবচেয়ে কম চেনে। বয়স্ক ডক্টরেট, সন্তানের জননী অধ্যাপিকারাও ঋতুচক্র হিসাব করতে জানেন না। তাই বৈজ্ঞানিক ও কাব্যিক বর্ণনায় নারী শরীর উপস্থাপন করেন। অনেকে শিউরে ওঠেন, অনেকে সুখী হন। এক অধ্যাপিকা বলেন, একজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের এমন বই লেখা ঠিক নয়, কারণ নারী ব্যাপারটি অশ্লীল। কিন্তু এক নিঃসঙ্গ ভগ্নবিবাহ আইনজীবী নারী জানান, এই অংশ পড়ে তিনি নিজেকে জেনেছেন; বারো বছর আগে কন্যা জন্ম হলেও নিজের দেহ জানতেন না।
দ্বিতীয় সংস্করণে দুটি নতুন পরিচ্ছেদ যোগ করেন—‘নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা’ এবং ‘নারীদের নারীরা, নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি’। তৃতীয় সংস্করণে যোগ হয় ‘ধর্ষণ’, যা তাঁর মতে সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলমানের প্রধান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নারীবাদীরা ধর্ষণের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তৈরি করেছেন; দেখিয়েছেন পুরুষতন্ত্র এটিকে দর্শনে পরিণত করে লৈঙ্গিক রাজনীতিতে ব্যবহার করছে।
বইটি পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, যদিও সহজ নয়। অনেকে নাম শুনে কিনে ভাবেন উত্তেজক খাদ্য পাবেন, কিন্তু পড়ে দেখেন দুরূহ। তবু দুরূহতায় আনন্দ পান; অনেকের বিশ্বদৃষ্টি বদলে যায়। আজকাল নারী নিয়ে প্রচুর লেখা হচ্ছে; এর ওপর ‘নারী’ বইটির প্রভাব স্পষ্ট। অনেকে বইটির পাতার পর পাতা চয়ন করে নিজেদের লেখায় ব্যবহার করেন; অজস্র পরিভাষা পরিণত হয় তাঁদের নিজস্ব সম্পত্তিতে।




