বিশ্বকাপসহ শীর্ষ টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করার একটি উদ্যোগের প্রেক্ষিতে ফিফা সভাপী জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। সিংহভাগ সদস্য সংস্থা তার বিপরীতে মত দেয়। পরবর্তীতে পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করলেও পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। বর্তমান মেয়াদ শেষ করার আগেই তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়িত হয়ে উঠেছে, আর পুনর্নির্বাচননের সম্ভাবনাও ক্ষীণতর হচ্ছে। আগামী বছরের মার্চে ফিফা কংগ্রেসের সামনে সভাপী নির্বাচন হওয়ার কথা। চতুর্থ মেয়াদের লড়াইয়ের ইচ্ছা ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন এই ইতালিয়ান। তবে সেই ভোটের মুখোমুখি হওয়ার আগেই তার চেয়ার টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউরোপের সংস্থাগুলোর মধ্য থেকেই ইনফান্তিনোর উপর আস্থাহীনতার সুর প্রথম শোনা যায়। ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএডব্লিউ) ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মেয়াদে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেয়। একই ধারায় সমর্থন প্রত্যাহার করে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ), এমন তথ্য ব্রিটিশ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এর সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ; উয়েফা যখন ফিফার বিরুদ্ধে আইনি পক্ষেপ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে, ঠিক তখনই আস্থাহীনতার এই খবর সামনে আসে।
মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হল বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রধান টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ইনফান্তিনোর প্রস্তাব। চারদিক থেকে তীব্র সমালোচনা আসার পর তিনি প্রস্তাব প্রত্যাহার করলেও তাতে আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। ইউরোপ ও উত্তর-মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ও কনকাকাফ প্রাথমিক থেকেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে উশঙ্কা জানিয়ে আসছে। তারা যৌথ বিবৃতি দিয়ে প্রস্তাবটির তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছিল। এখন যে তার বিরুদ্ধে আস্থাহীনতার এই ঢেউ থামবে, সেই নিশ্চয়তা নেই।
বার্তা সংস্থা রেডটার্স জানাচ্ছে, ফিফার মোট ২১১টি সদস্য দেশের ২০ শতাংশ যদি লিখিতভাবে আবেদন করে, তবে একটি বিশেষ কংগ্রেস ডেকে ভোটের মাধ্যমে ইনফান্তিনোর বিরোধীরা তাকে অপসারণ করতে পারে। আবেদন জমা পড়ার তিন মাসের মধ্য ওই কংগ্রেস ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে, ফিফা কাউন্সিলও ৩৭ জন সদস্যের মধ্যে ১৯ জনের অনুরোধে জরুরি বৈঠক ডাকতে পারে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে হতে হবে। এই প্রক্রিয়াগুলো বিরোধী প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নতুন পথ খুলে দেবে।
তবে ইনফান্তিনোকে সরানো অতটা সরল নাও হতে পারে। ফিফার প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটের মূল্য সমান। ইউরোপীয় ফুটবলের শক্তিশালী দেশগুলোর আস্থা ধরে রাখার চেয়ে, ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখাটাই তার জন্য কৌশলগতভাবে বেশি জরুরি। কারণ এসব দেশ ফিফার আর্থিক অনুদানের ওপর ভীষণরকম নির্ভরশীল।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে চাপ বাড়ার পরও ফুটবলে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা কাতার, লেবানন, কুয়েত ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলো প্রকাশ্যে ফিফা সন্তাপীর প্রতি তাদের পুনরায় সমর্থন জানায়। ২০২৩-২৬ চক্রে ফিফার সদস্য দেশগুলো উন্নয়ন প্রকল্পে ৩০ লাখ ডলার পর্যন্ত দাবি করতে পেরেছে, যা পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ১০ লাখ ডলার বেশি। ধনী দেশগুলোর কাছে এটি তুচ্ছ অর্থ হলেও উন্নয়ণশীল দেশের জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আর্থিক ক্ষমতার বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাবের একটি মডেল তৈরি হয়েছে। ফলে ক্ষমতাধর সন্তাপীকে সরাতে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় অভিজাত প্রচারণার সীমায় আটকে যেতে পারে।
ফিফার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ানো সত্ত্বেও সংকটে ইনফান্তিনো, সমর্থন হারাচ্ছেন ইউরোপে
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি খাতে বিক্রির উদ্যোগের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর চেয়ার হুমকির মুখে। ইউরোপের দেশগুলো সমর্থন প্রত্যাহার শুরু করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোই হতে পারে তার মূল রক্ষাকবচ।



