দীর্ঘ দেড় বছর যুক্তরাজ্যে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা শেষে গত ৩ আগস্ট দেশে ফিরেছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রধান ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশে মাত্র ১০ দিন কাটিয়ে ১২ আগস্ট আবারও লন্ডনে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। এরই মধ্যে তাঁর স্মৃতিশক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও সেই গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক রুবাইয়াত রহমান। তিনি জানান, ইলিয়াস কাঞ্চনের স্মৃতিশক্তি এখনো একদম পরিষ্কার; তবে অসুস্থতার কারণে কথা বলার সমন্বয়ে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ রুবাইয়াত রহমান ইলিয়াস কাঞ্চনের চিকিৎসার সময় লন্ডনেই ছিলেন এবং ৩ আগস্ট তাঁর সঙ্গে ঢাকায় ফেরেন। বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইলিয়াস কাঞ্চন নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়ছেন এবং তিনি নিজেও তাঁর সঙ্গে নামাজে অংশ নিয়েছেন, এমনকি ইলিয়াস কাঞ্চন ইমামতি করেছেন। খাবারদাবারের কোনো সমস্যাও নেই তাঁর।

চিকিৎসার বিষয়ে রুবাইয়াত রহমান জানান, মস্তিষ্কের যে অংশে টিউমারটি রয়েছে, সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। তবে সময়মতো যুক্তরাজ্যে যাওয়ায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারের একটি বড় অংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর তাঁকে টার্গেটেড কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রোগের অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করছেন এই চিকিৎসক। তবে রোগটি খারাপের দিকে যাচ্ছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছেন—এমন গুঞ্জনের জবাবে রুবাইয়াত রহমান বলেন, তাঁর স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ পরিষ্কার। কিছু মনে করিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা স্মরণ করতে পারেন। তাঁর একমাত্র সমস্যা হলো বক্তৃতার সমন্বয়। মস্তিষ্কের যে অংশে টিউমারটি অবস্থান করছে, সেটি কথার সঙ্গে কথার সমন্বয় ঘটায়; সেখানেই কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারেন এবং সবকিছু মনে রাখেন। ঢাকায় ফেরার আগে লন্ডনে তাঁর একটি সিটি স্ক্যান করা হয়েছিল। ওই রিপোর্টে টিউমার বাড়ার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি, যা ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন চিকিৎসক।

দেশে ফেরার আগে গত বছরের এপ্রিলে ব্রেন টিউমার ধরা পড়লে লন্ডনে যান ইলিয়াস কাঞ্চন। সেখানে হাসপাতালের পাশাপাশি মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় থেকে চিকিৎসা চলেছে। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। টিউমারের বড় অংশ অপসারণ করা গেলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার বের করা সম্ভব হয়নি। পরে চিকিৎসকেরা জানান, এটি ব্রেন ক্যানসার। অস্ত্রোপচারের পর প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি ও ওরাল থেরাপি নেন তিনি। সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসায় তাঁকে ৬০টির বেশি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও তিন মাস ওরাল থেরাপি নেন। তিন ধাপ মিলিয়ে প্রায় শতাধিক কেমোথেরাপি নিয়েছেন এই অভিনেতা।

চিকিৎসক রুবাইয়াত রহমানের মতে, যতক্ষণ রোগের অবনতি না হচ্ছে, ততক্ষণ নতুন কোনো আক্রমণাত্মক চিকিৎসা শুরু হবে না। রেডিওথেরাপির প্রয়োজন না থাকলেও টিউমার যাতে না বাড়ে, সেজন্য কেমোথেরাপি চালিয়ে যেতে হতে পারে। দেশে থাকাকালীন নিসচার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন; কাকরাইলের নিসচা কার্যালয়েও গিয়েছিলেন। এ ছাড়া বাসায় সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। লন্ডনে ফেরার আগে ১১ আগস্ট কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়ায় নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করেন এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে সময় কাটান।