বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর একটি ম্যাচ শুধু প্রতিপক্ষ নয়, বরং পুরো একটি পরিবেশের বিপক্ষে লড়াইয়ের নাম হতে পারে। কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। কিন্তু টমাস টুখেলের দলের জন্য আজতেকা স্টেডিয়ামের এই ম্যাচটি হয়ে উঠেছে এক অগ্নিপরীক্ষা। এর পেছনে কাজ করছে উচ্চতা, প্রচণ্ড গরম, শব্দদূষণ, নিদ্রাহীনতা এবং চার দশক আগের এক ঐতিহাসিক ভূত।

ইংল্যান্ড দল শুক্রবার মেক্সিকো সিটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় জনতার তীব্র বিদ্বেষের মুখোমুখি হয়। দাঙ্গা পুলিশের ব্যারিকেড ও সশস্ত্র প্রহরায় তাদের হোটেলে প্রবেশ করতে হয়। মেক্সিকান সমর্থকরা অতিথিদের ‘আপ্যায়নে’ বদ্ধপরিকর। আগের রাউন্ডে ইকুয়েডর দলকে লাউডস্পিকার ও মোটরগাড়ির হর্ন বাজিয়ে নির্ঘুম রাত উপহার দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডও এখন একই আতঙ্কে ভুগছে। হোটেলের ঠিকানা গোপন রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কোচিং স্টাফ খেলোয়াড়দের হাতে প্রাকৃতিক ঘুমের ওষুধ, হোয়াইট নয়েজ মেশিন তুলে দিচ্ছেন, অনেকে নিজ উদ্যোগে ইয়ারপ্লাগ সঙ্গে এনেছেন।

তবে শব্দ মূল সমস্যা নয়, আসল ‘খলনায়ক’ হলো উচ্চতা। মেক্সিকো সিটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ফুট। এত উচ্চতায় শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ মানিয়ে নিতে সাধারণত দুই সপ্তাহ প্রয়োজন। অথচ ইংল্যান্ড পেয়েছে মাত্র দুই দিন। কোচ টুখেল নিজেই স্বীকার করেছেন, এই অল্প সময়ে মানিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ঘরের মাঠের দর্শক ও উচ্চতার এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই মেক্সিকো পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলছে। ৪০ বছরে তারা নকআউটে প্রথম জয় পেয়েছে এবং চার ম্যাচে একটিও গোল হজম করেনি। আজতেকায় মেক্সিকোর রেকর্ড অবিশ্বাস্য—৮৯ ম্যাচে হার মাত্র ২টি। বিশ্বকাপের ১০ ম্যাচের কোনোটিতেই তারা এই মাঠে হারেনি।

অন্যদিকে, আজতেকায় ইংল্যান্ডের একটি তিক্ত স্মৃতি বিজড়িত। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং এর কিছুক্ষণ পরই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র জন্য চিরস্মরণীয়। টুখেলের আরও বড় চিন্তা হলো, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর থেকে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স ক্রমশ বিবর্ণ হয়েছে। কঙ্গোর বিপক্ষে হ্যারি কেইন ত্রাতা হিসেবে না এলে ‘ইটস কামিং হোমের’ স্বপ্ন ভেস্তে যেতে পারত।

এত বাধার মধ্যেও ইংল্যান্ডের ভরসা অধিনায়ক হ্যারি কেইন। তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি যা–ই হোক না কেন, যে সুযোগই পাই না কেন, আমার মনে হচ্ছে মাঠে নামলে আমি গোল করতে পারব।’ ঠিক তেমনি মেক্সিকোর আস্থার প্রতীক কলম্বিয়া বংশোদ্ভূত ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনোনিয়েস, যিনি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে ৩ গোল করেছেন।

এসব উত্তেজনার মধ্যে যোগ হয়েছে গুপ্তচরবৃত্তির গুঞ্জন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের দাবি, কানসাস সিটির ঘাঁটি থেকে মেক্সিকো সিটিতে আসার সময়সূচি পরিবর্তনের একটি কারণ ছিল প্রতিপক্ষের নজরদারি এড়ানো। ম্যাচের আগের দিন ফিফা কিক-অফ ছয় ঘণ্টা এগিয়ে আনার কথা বিবেচনা করেছিল, কারণ পূর্বাভাসে রোববার বজ্রঝড়ের প্রবল ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশনের আপত্তিতে ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই শুরু হওয়ার কথা, যদি শেষ মুহূর্তে ঝড়বৃষ্টি বাধা না দেয়।