খোলা ভোজ্যতেল বিক্রির ক্ষতিকর দিক ও ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিংবিহীন ব্যবহারযোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েময়তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন। প্রথম আলো ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গত ২৮ জুলাই রাজধানীর প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং’ শীর্ষক একটি গোলটেবল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, শিল্প সমিতি, জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান, ভোজ্যতেলের লাইসেন্স প্রদানের সময় প্যাকেজিং মান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। প্রতিটি প্যাকেজ অনুমোদনের আগেই বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হচ্ছে। তিনি উৎপাদকদের আইনি ন্যূনতম মাত্রা পূরণ নয়, বরং আরও বেশি ভিটামিন ‘এ’ সংযোজনে উৎসাহিত করেন এবং বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে গুণগত মান রক্ষার কথা বলেন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সেবাষ্টিন রেমা ভোক্তা সচেতনতার অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন। তাঁর মতে, ফুড-গ্রেড প্যাকেজিংয়ের ধারণা জনগণের কাছে বোধগম্য নয়, তাই এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা প্রয়োজন। খোলা তেল কেনার প্রবণতা এখনো ব্যাপক, যেখানে পণ্যের উৎস ও মান নিশ্চিত করা কঠিন। অধিদপ্তর গত এক বছরে সচেতনতামূলক কর্মশালায় বেশি জোর দিয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতান আলম বলেছেন, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংমিশ্রণ কার্যক্রম অনেকটাই সফল। তবে খোলা তেলের বিস্তারই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কেমিক্যালের ড্রামে তেল সংরক্ষণ স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ সমস্যা সমাধানে বিটাকের সঙ্গে মিলে ফুড-গ্রেড ও শনাক্তযোগ্য কন্টেইনার তৈরির চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব জোর দিয়ে বলেন, উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেটে পৌঁছানোর পুরো পথেই নিরাপদ প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ১৭৯টি নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, বোতলজাত তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর উপস্থিতি খোলা তেলের চেয়ে বেশি। তাই তিনি খোলা তেল বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি তোলেন।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী স্বচ্ছ তেলই ভালো— এহেন প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা বদলানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আলো ও তাপের হাত থেকে তেলকে সুরক্ষায় অস্বচ্ছ প্যাকেজিং অপরিহার্য। শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, বড় উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী তুলে ধরেন যে, ভোক্তারা স্বচ্ছ তেলকে অগ্রাধিকার দিলেও আদতে সঠিক পরিশোধিত তেল কিছুটা কম স্বচ্ছ হয় এবং এতে ভিটামিন ‘ই’-সহ উপকারী উপাদান বেশি থাকতে পারে। তাই স্বচ্ছতা নয়, পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ খোলা তেল বিক্রি বন্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিএসটিআই-এর মানদন্ডে অস্বচ্ছ প্যাকেজিং বাধ্যতামূলক না থাকা একটি বড় ঘাটতি বলে উল্লেখ করে তিনি এটি দ্রুত সংশোধনের তাগিদ দেন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে দেন, একই তেল বারবার ব্যবহারে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম তাঁর গবেষণা সুদ্ধৃত করে জানান, আলোতে রাখা স্বচ্ছ প্যাকেটে নয় মাসের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলেও, অন্ধকারে অস্বচ্ছ প্যাকেটের তেলে এক বছর পরও ক্ষতি অতি সামান্য।

শিল্পপক্ষ থেকে মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কুতুবুল আলম জানান, তাদের ৬০ শতাংশ তেল এখনও ড্রামে সরবরাহ করতে হয় বাজারের চাহিদার কারণে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির প্রতিনিধি কে এম ইকবাল হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, বিদ্যমান প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি দিয়েই অল্প খরচে বোতলকে অস্বচ্ছ বা আধা-অস্বচ্ছ করা সম্ভব। তাই নীতিগত সিদ্ধান্তই এখন প্রধান চাবিকাঠি। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির প্রতিনিধি ফিরোজ আলম সুমন জানালেন, খোলা তেলের বড় অংশটি রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত হলেও তেলের নিম্নমানের জন্য উৎপাদক নয়, তাদেরকেই জরিমানা গুনতে হয়।

সকল অংশীজন মতৈক্যে পৌঁছান যে, ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল আলো ও তাপের ক্ষতি থেকে রক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে এবং এর পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও এর কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপদতা সম্ভব।