ওয়ারেন বাফেট দীর্ঘদিন ধরে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ারহোল্ডারদের কাছে ১০,০০০ শব্দেরও বেশি চিঠি লিখে এসেছেন। কিন্তু সেই দীর্ঘতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না শুধু বেশি কথা বলা। বাফেট চাইতেন যেন তাঁর বোনেরাও—যারা বুদ্ধিমান হলেও অর্থনীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ নন—সহজে বুঝতে পারেন। দশকের পর দশক ফলাফলের মাধ্যমে তিনি পাঠকের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন, তারপর স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি গ্রেগ অ্যাবেলও এ বছর প্রথম চিঠিতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। এই মডেলটি এখনকার প্রযুক্তি প্রধানদের লেখার সঙ্গে তুলনা করলে একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে।
সম্প্রতি মেটার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল ও সুযোগ কীভাবে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, বিশেষত ডেটা সেন্টার স্থাপনকারী সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের মতো সন্দেহবাদীদের কাছে—এই বিষয়ে ৬,৫০০ শব্দের একটি বিস্তারিত লেখা প্রকাশ করেন। এটি গড় উপন্যাসের প্রায় এক-দশমাংশ এবং এক বছর আগে তাঁর ‘পার্সোনাল সুপারইনটেলিজেন্স’ শীর্ষক লেখার চেয়ে দশ গুণ দীর্ঘ। জাকারবার্গ একা নন; অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও অ্যামোডি ২০২৪ সালে এই ধারার সবচেয়ে দীর্ঘ ১৩,০০০ শব্দের ‘মেশিনস অফ লাভিং গ্রেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংসহ অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও একই পথে হেঁটেছেন।
এই লেখাগুলোর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা উচ্চাকাঙ্ক্ষী। মেটা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করছে এবং ওয়াল স্ট্রিট সেই খরচের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে, পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী গবেষণাগারগুলো আধিপত্যের দৌড়ে রয়েছে—তখন এসব প্রতিষ্ঠাতা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। তাঁরা চান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ মানুষকেও সেই পথে নিয়ে আসতে। কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ড্যান ওয়াংয়ের মতে, পণ্য বিক্রির আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন উপকারী হতে পারে, সেই সীমারেখা নির্ধারণ করা তাঁদের জন্য অপরিহার্য।
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক রিককার্ডসের দৃষ্টিতে এর একটি কম আকর্ষণীয় ব্যাখ্যাও রয়েছে। তাঁর মতে, বিশেষত প্রযুক্তি প্রধানরা মনে করেন তাঁদের কথা যেন ধর্মগ্রন্থের মতোই পবিত্র। এই প্রবন্ধগুলো আসলে মাঠে পতাকা গেড়ে দেওয়ার মতো—প্রায় পাঁচ-ছয়জন প্রধান নির্বাহী নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছেন, কার রচনার দৈর্ঘ্য ও প্রভাব বেশি। আমাদের বর্তমান স্বল্প মনোযোগের যুগে তাই একটি স্পষ্ট প্রশ্ন উঠে আসে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাইরে আসলে কেউ কি এসব পড়ছেন?
বাফেট জানতেন তাঁর পাঠক কারা। কিন্তু জাকারবার্গ, অ্যামোডি ও অন্যান্যরা মূলত একে অপরের উদ্দেশে লিখছেন—এটি প্রতিষ্ঠাতা, বিনিয়োগকারী ও তাঁদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশনকারী সাংবাদিকদের একটি বদ্ধ চক্র। প্রতিটি প্রবন্ধ যেন আগেরটির জবাব দিচ্ছে। কিন্তু এটি কি সঠিক পাঠকগোষ্ঠী? জাকারবার্গ বর্তমানে জনসাধারণের চাপের মুখে রয়েছেন; ডেটা সেন্টার নিয়ে স্থানীয় মানুষের সন্দেহ বাড়ছে এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও কম। এমন পরিস্থিতিতে ৬,৫০০ শব্দের একটি ইশতেহার মানুষের মনোভাব বদলাতে পারে—এমন সম্ভাবনা কমই মনে হয়।
যদি কোনো প্রধান নির্বাহী বাফেটের কাছ থেকে একটি শিক্ষা নিতে পারেন, তা হলো—লেখা সহজ; কিন্তু পাঠ হওয়ার অধিকার অর্জন করাই কঠিন কাজ। এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফর্চুন ডটকমে প্রকাশিত হয়েছিল।




