মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্ট ড. টমাস জেফরি ‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত এক লেখায় ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুদ্ধিমত্তার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, অনেকের ধারণার বিপরীতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোই বুদ্ধিমত্তার একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং কখন বিরতি নিয়ে ভাবতে হবে, সেই ক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর স্ত্রীর মধ্যে এমন এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা রয়েছে যা প্রথমে তাঁকে বিরক্ত করত। স্ত্রী কোনো বিষয়ে তাড়াহুড়া না করে সময় নিয়ে চিন্তা করেন, যা জেফরির কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই ধীরস্থির দৃষ্টিভঙ্গি অধিক কার্যকর।

জেফরি লেখায় প্রাচীন স্টোয়িক দর্শনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো কেউ কতটা জানে তা নয়, বরং কোনো পরিস্থিতিতে সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। তিনি রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের উদাহরণ টেনে বলেন, চাপের মুখেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার গুণটিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। জেফরি তাঁর নিজের স্বভাবকে একটি শক্তিশালী, দ্রুত ও অস্থির ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার লাগাম তিনি তাঁর স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছেন। স্ত্রী তাঁকে থামিয়ে সহজ একটি প্রশ্ন করেন—‘আসলে এখানে কী ঘটছে?’—যা তাঁকে অসংখ্য ভুল সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করেছে।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, দুজন ব্যক্তি একই খারাপ খবর পেলে একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখান, যা বাইরে থেকে কার্যকর মনে হলেও তাড়াহুড়ায় প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যজন বিরতি নিয়ে নিজের অনুভূতিকে জায়গা দেন এবং সেই ছোট্ট বিরতিতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। জেফরি এপিকটিটাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আপনার সঙ্গে কী ঘটল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি তার প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানালেন।” তিনি গরম জিনিস ধরার উপমা দিয়ে বলেন, ঠিক সময়ে প্রতিক্রিয়া জানানোই আসল দক্ষতা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার বলেন, ড. জেফরির অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত এবং এ থেকে ঢালাওভাবে বলা যাবে না যে নারীরা বেশি পজ-প্র্যাকটিস (থেমে চিন্তা করা) করেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট গবেষণা নেই; বরং বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফল এসেছে। রাউফুন নাহার অ্যাটাচমেন্ট থিওরির উল্লেখ করে বলেন, সাধারণত নারীদের মধ্যে আবেগীয় সত্তার বেশি ব্যবহার ও সম্পর্কে নির্ভরশীলতা দেখা যায়, অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে দূরত্ব রেখে চলার প্রবণতা বেশি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, লিঙ্গভিত্তিক সাধারণীকরণ ঠিক নয়। কারণ প্যারেন্টিং ও সামাজিক শিক্ষা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ছেলেশিশুকে যদি সহানুভূতি শেখানো হয়, তবে তার মস্তিষ্কেও অক্সিটোসিন ও ইস্ট্রোজেনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা আবেগীয় বন্ধন তৈরি করে।

রাউফুন নাহার শেষে বলেন, কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে বা সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বরং ‘টক্সিক পজিটিভিটি’ এড়িয়ে আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানোই সমীচীন।