২০১৮ সালের মার্চে শুরু হওয়া সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। ‘শাহ আরেফিন (রহ.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু’ নামে পরিচিত এই সেতুর একটি পাড়ে বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি ও অন্য পাড়ে বিন্নাকুলী গ্রাম। ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৫ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। প্রকল্পের সময়সীমা ছিল ৩০ মাস, অর্থাৎ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময়সীমা পার হয়ে আট বছর কেটে গেলেও প্রকল্পের কাজ এখনো অসমাপ্ত। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সেতুর ১৫টি পিলারের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। মোট ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৫৩টি এবং ১৫টি স্ল্যাবের মধ্যে ১০টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৩০ ভাগ কাজ এখনো বাকি। গত ১৯ মে রাতে কাজ চলাকালীন সেতুর পাঁচটি গার্ডার নদীতে ভেঙে পড়ার পর থেকে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

এলজিইডি সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, পুরোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে চুক্তি ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং চলতি মাসের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তাঁর মতে, নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পর বাকি কাজ শেষ হতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে, ফলে প্রকল্পের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন মাস। সেতুটি নির্মাণে শুরু থেকেই গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। করোনা মহামারি, বন্যা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও যাতায়াতের সমস্যাসহ নানা অজুহাতে কাজ বহুবার বন্ধ ছিল। এলজিইডির বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও কাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়নি। গত বছর জুন মাসে কাজ ফেলে চলে গিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি, পরে আবার কাজে ফিরলেও সর্বশেষ গার্ডার ভেঙে পড়ার ঘটনার পর তাদের চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়।

সেতুটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র হতাশা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী ও সংস্কৃতিকর্মী অমিয় হাসান বলেন, আগামী জুনের কথা বলে আট বছর কেটে গেছে। এখন আবারও দুই বছর সময় লাগবে বলা হচ্ছে, ফলে এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। স্থানীয় ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও পরিবেশ এবং হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা জানান, কাজের ধীরগতি ও গাফিলতির প্রতিবাদে এলাকায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এই সেতুটি চালু হলে মধ্যনগর হয়ে নেত্রকোনা জেলা সদর এবং ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। মধ্যনগরের মহিষখলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ আগেই চালু হয়েছে, ঢাকা থেকে সরাসরি মহিষখলা আসা যাচ্ছে। কিন্তু সেতুটি না হওয়ায় যাতায়াতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমছে না। বিন্নাকুলি গ্রামের বাসিন্দা তানভীর আহমদের মতে, যাদুকাটা নদীর খেয়া পারাপারে প্রায় প্রতিবছরই দুর্ঘটনা ঘটে এবং মানুষ প্রাণ হারায়। সেতুটি চালু হলে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও মধ্যনগর—এই তিন উপজেলার মানুষ উপকৃত হবেন এবং পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়বে।

সেতুটির আশপাশে একাধিক পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। যাদুকাটা নদীর তীরেই শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানা এবং পাশের সবগ্রামে শ্রীশ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান অবস্থিত। এর পাশেই একটি সীমান্ত হাট রয়েছে। নদীর পশ্চিম তীরে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বারিক টিলা। টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রি লেক), টেকেরঘাট—এসব স্থানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক সমাগম হয়। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় বগছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্কস্টেশন থাকায় সুনামগঞ্জ শহরের ব্যবসায়ীদেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সেতুটি চালু হলে পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ব্যাপক সুবিধা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানান, একটি সেতুর জন্য এলাকাবাসী আর কতদিন অপেক্ষা করবে—এটা ভাবনার বিষয়। তিনি নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন।