নড়াইলের শিবানী সেন গ্রামের ৮ থেকে ১০টি বাড়ি থেকে গাভির দুধ সংগ্রহ করে ভ্যানে করে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে নিয়ে বিক্রি করেন। সেই সামান্য আয়ে চলে তাঁর সংসার। এমন একটি পরিবারের মেয়ে শান্তা পাবনা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলে আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেড়ে যায়। দূরে পড়াশোনার খরচ বহন করা সম্ভব নয় ভেবে পরে মাইগ্রেশন করে তাঁকে যশোর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান বাবা। স্থানীয় মানুষের সহায়তায় ভর্তি সম্পন্ন হলেও সামনে আসে পাঁচ বছরের পড়াশোনার খরচের প্রশ্ন। অর্থাভাবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থমকে যাওয়ার মুখে পাশে দাঁড়ায় প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া (পিএইচএ) প্রথম আলো ট্রাস্টের মাধ্যমে। তাদের মাসিক বৃত্তির আওতায় এসে নতুন করে পথ খুঁজে পান শান্তা। বর্তমানে যশোর মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন তিনি। শান্তা বলেন, ‘পিএইচএ এবং প্রথম আলো ট্রাস্টের দেওয়া স্কলারশিপ আমার শিক্ষাজীবনে নতুন অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে এমন মহৎ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।’ শান্তা একা নন, দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজের অসচ্ছল ১৫ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে পিএইচএ।

শান্তাদের পাশে দাঁড়ানো পিএইচএ-র সামাজিক উদ্যোগের একটি অংশ। তবে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য চিকিৎসকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাশিক্ষা বিস্তারে কাজ করা। ২০২০ সালে যাত্রা শুরুর পর অল্প সময়েই চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, জনস্বাস্থ্যসচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতে পরিচিত একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে পিএইচএ। সম্প্রতি ঢাকায় চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলেন সংগঠনটির মূল উদ্যোক্তা ডা. তাসবিরুল ইসলাম। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই পালমোনারি অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ জানান, ২০০৮ সাল থেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন তিনি। তবে উদ্যোগগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। স্থায়ী কাঠামো না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিজের অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে দেশে আসেন তাসবিরুল। সেই অনিশ্চিত সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসকেরা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা করতেন রোগীর চিকিৎসা, নতুন গবেষণা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে। সেই আলোচনায় বারবার উঠে আসে প্রশ্ন—বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কীভাবে আরও সংগঠিতভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। সেই ভাবনা থেকেই ডা. শাকিল ফারিদ, ডা. বি এম আতীকুজ্জামান, ডা. চৌধুরী এইচ আহসান, ডা. মো. জাকের উল্লাহ, ডা. নাসের খান ও ওমর শরীফকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া। ২০২০ সালের জুলাইয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও নভেম্বরে এটি নিবন্ধিত ট্রাস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে সাত সদস্যের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

শুরুর দিকে অনলাইনভিত্তিক ওয়েবিনারের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর পিএইচএ সরাসরি সম্মেলন, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজন শুরু করে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রায় ৩৫০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪০০-এর বেশি ওয়েবিনার, তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং ২০টির বেশি কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করেছে। কার্ডিওলজি, অনকোলজি, সার্জারি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, জনস্বাস্থ্যসহ ২৫টির বেশি বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুধু রাজধানী নয়; সিলেট, চট্টগ্রাম ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও স্ট্রোক, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সম্মেলন আয়োজন করেছে পিএইচএ। বর্তমানে দেশ-বিদেশের দুই শতাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রতিষ্ঠানটির ফ্যাকাল্টির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ২০২৩ সালে পিএইচএ-র উদ্যোগে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল ঢাকায় এসে জরুরি চিকিৎসা ও সার্জারি বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে। পাশাপাশি মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের গবেষণা, নেতৃত্ব ও উপস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছে সংগঠনটি।

পিএইচএ-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. তাসবিরুল ইসলাম জানান, তাঁদের লক্ষ্য এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বিদেশের রোগীরাও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে আসবেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও এ দেশের মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনায় আগ্রহী হবেন। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি আন্তর্জাতিক মাল্টি-স্পেশালিটি গ্লোবাল সামিট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী বেসিক লাইফ সাপোর্ট (সিপিআর) প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও রোগতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, আধুনিক মেডিকেল কারিকুলাম প্রণয়ন, জরুরি চিকিৎসাসেবা (ইএমএস)–বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর কর্মসূচি এবং দ্বিতীয় মেডিক্যাল অলিম্পিয়াড আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ছয় বছরের পথচলায় প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া প্রমাণ করেছে, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো বাধা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে সুফল দিচ্ছে—চিকিৎসক, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। শান্তা সেনের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কেবল একটি বৃত্তি নয়, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখার নামান্তর।