রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান গ্যালারিতে চলমান 'দ্য কোয়ায়েট উইদিন' শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশি সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামানের গত পাঁচ বছরের তোলা ছবি। জনাকীর্ণ মেগাসিটির দৈনন্দিন ব্যস্ততা, শব্দ ও আলো দূষণ এবং যানজটের মধ্য থেকে খানিকটা সময় বের করে নীরবতা খুঁজতে আসা দর্শকেরা ছবিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থমকে যান। প্রদর্শনীতে ঘুরে দেখা গেছে, অনেকে ছবির সামনে কয়েক পলক থেমে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, যেন যান্ত্রিক জীবনের তীব্র গতি থেকে কিছুটা দম নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
রাশেদ জামানের ছবিগুলো আলোকচিত্র নাকি চিত্রকর্ম—এই দুইয়ের সীমানায় অবস্থান করছে না। বরং এই দুই মাধ্যমের মাঝামাঝি এক ধরনের 'নো ম্যানস ল্যান্ডে' দাঁড়িয়ে থাকা নীরব, তীব্র অনুভূতির মতো মনে হয়। অধিকাংশ ছবিই প্রায় একরঙা, অথবা খুব কাছাকাছি টোনের অল্প কয়েকটি রঙের সমন্বয়ে সাজানো। ছবিতে উপাদানও খুব কম রাখা হয়েছে, ফলে দর্শকের মনে এক ধরনের আরাম ও স্বস্তির ভাব তৈরি হয়। সূর্যকে ধরা হয়েছে তার সবচেয়ে কোমল মুহূর্তে, যেন প্রতিটি ফ্রেমে আলো তরল হয়ে মোমের মতো গলে চুইয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রকৃতির অবয়বের সঙ্গে মিশে আছে গভীর, স্বপ্নময় নীল। কোনো ছবিতে খোলা প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে একটি গাছ, আবার কোনো ছবিতে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। পুরো প্রদর্শনীতে কেবল একটি মানুষের ছবি রয়েছে, যিনি নিঃশব্দে যেন বলে যাচ্ছেন, মানুষ মূলত একা, মহাশূন্যের মতো একা।
নিজের কাজের প্রেরণা সম্পর্কে রাশেদ জামান জানান, বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা, ভিড় আর শহুরে কোলাহলের মধ্যে তাঁর জীবন থেকে নির্জনতা, একাগ্রতা ও মৌনতার মতো শব্দগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। বছরের পর বছর হাজারো মানুষের সঙ্গে কথা বললেও নিজের সঙ্গে নিজের যে কথোপকথন, সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, এই যাত্রাটি ছিল তাঁর কাছে আত্মানুসন্ধানের মতো। ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর শৈশবের একটি স্মৃতি থেকে আলোর প্রতি তাঁর এই অনুরাগের শুরু। তাঁর নানা ভোরে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে আতর মেখে পূর্বদিকের জানালার ধারে চেয়ার পেতে লিখতে বসতেন। জানালা দিয়ে আসা আলো এসে পড়ত তাঁর শরীরে, আর সেই আলোর স্পর্শেই ঘুম ভাঙত ছোট্ট রাশেদের। সেখান থেকেই তিনি শিখেছেন আলো কীভাবে মানুষের শক্তিকে প্রভাবিত করে। এই কারণে তিনি সব সময় ক্যামেরা দিয়ে আলো দিয়ে কবিতা লিখতে চেয়েছেন—যেমন কবিতায় অল্প কয়েকটি শব্দে অনেক কথা বলা যায়, তেমনই ছবিতে স্বল্প উপাদানের মধ্যে আলো মাখিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
কিছু ছবিতে গাছের পাতা, আকাশ ও দিগন্তরেখায় ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রাশ পেইন্টে অস্পষ্টতা আনা হয়েছে। এর ফলে মূর্ত পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিমূর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে, আলো-আঁধারের মধ্যে বাস্তব দৃশ্য যেন পরাবাস্তবতায় উঁকি দিচ্ছে। আলোর এমন তরলের মতো মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবতার ওপর একধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হয়েছে, যা দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগায়—আকাশের শেষ কোথায়, মাটি বা নদীর শুরুই বা কোথা থেকে? একটি ফ্রেমের মধ্যেই অল্প উপাদানে মহাবিশ্বের বিশালতা ধরা দিয়েছে। আলো নিয়ে এমন কাব্যিক নিরীক্ষাই দর্শকদের ছবির সামনে থামতে বাধ্য করছে।
২০০৬ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের 'আ লিটল পিস' প্রকাশনার প্রচ্ছদে এই চিত্রগ্রাহকের তোলা ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি জানান, ছবি তৈরির প্রক্রিয়ায় তিনি নিয়মিত বসুন্ধরা থেকে ধানমন্ডি যাতায়াত করেন। ছবি প্রিন্ট করিয়ে সেটি দেখেন, ঠিকঠাক করেন, আবার প্রিন্ট করান। এভাবে প্রায় আড়াই বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। সাধারণত প্রিন্ট করার পর ছবিটি ময়েশ্চারাইজড করেন, তার ওপর ড্রাই ব্রাশ করেন। কোথাও টেক্সচার বের করে আনেন, কোথাও স্যাচুরেশন কমান। সবশেষে স্প্রে করে ফিনিশিং টানেন। প্রদর্শনীটি ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।




