প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে টানা তিন বছর কোনো সাহিত্যকর্ম রচনা করেননি। এই সময়টিতে তিনি আধ্যাত্মিক অশান্তিতে ভুগছিলেন এবং সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বন্ধুর তীক্ষ্ণ সমালোচনা ও নিন্দুকদের জবাব দেওয়ার তাগিদে তিনি পুনরায় লেখালেখিতে ফিরে আসেন।
তাঁর আত্মজীবনী অনুযায়ী, ওই তিন বছর তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত অস্থির ছিলেন। লিখতে ইচ্ছে না হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণভাবে লেখা বন্ধ করে দেন, বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করেন, এবং একাকী কান্নায় সময় কাটাতেন। পূজার সময় কিংবা রবীন্দ্রনাথের গান শুনলেও তাঁর অশান্তি দূর হতো না। পরিবারের লোকেরা ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন মা তারার কৃপায় তাঁর জন্ম। তাঁর নামও রাখা হয়েছিল সেই দেবীর নামানুসারে।
তবে এই অস্থিরতার মধ্যেই তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার ও সাহিত্য আকাদেমির মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেন। কিন্তু পুরস্কারের আনন্দ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রকাশক, সম্পাদক ও লেখক বন্ধুরা তাঁর কাছ থেকে লেখা পেতে ব্যর্থ হয়ে হতাশ হয়ে পড়েন।
ঠিক এই সময়ে কলকাতার পথে এক সন্ন্যাসীর সান্নিধ্যে আসেন তিনি। সন্ন্যাসী আগুন স্পর্শ করে সাধনা করতেন, যা তারাশঙ্করকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। তিনি সংসার ত্যাগ করে তাঁর শিষ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যখন সন্ন্যাসীর কাছে যান, তখন জানতে পারেন তিনি চলে গেছেন। তারাশঙ্কর সন্ন্যাসীর সন্ধানে কাশী যাত্রা করেন। পথে আনন্দসুন্দর ঠাকুর নামে এক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তারাশঙ্কর তাঁর অশান্তির কথা জানালে আনন্দসুন্দর তাকে বলেন যে তাঁর সাধনার পথ সাহিত্য, এবং সেটিকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে। এই উপদেশে তারাশঙ্কর কলকাতায় ফিরে আসেন এবং নিজের মায়ের কাছ থেকে দীক্ষা নেন। কিন্তু তাতেও তাঁর মনের শান্তি ফিরে আসেনি।
অবশেষে একদিন বর্ধমানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাজি হন আয়োজকদের পীড়াপীড়িতে। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে তিনি সিদ্ধান্ত বদল করে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন। তখন তাঁর বন্ধু জগদীশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা হয়। ভট্টাচার্য তাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বলেন, তার এই আচরণে বাংলার মানুষ লজ্জিত, এবং নিন্দুকরা বলছে তিনি আর কখনো লিখতে পারবেন না। এই কথা শুনে তারাশঙ্করের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।
তিনি আগেই স্থির করেছিলেন দুর্গাপূজার সংখ্যায় কিছু লিখবেন না এবং প্রকাশকদের না করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুর কথায় নিন্দুকদের জবাব দিতে তিনি মত পরিবর্তন করেন। একে একে তিনি পূজা সংখ্যায় 'দেশ' পত্রিকায় 'রাধা', 'আনন্দবাজারে' 'বিচারক', 'শনিবারের চিঠি'তে একটি একাঙ্কিকা এবং 'তরুণের স্বপ্ন'-এ 'পঞ্চপুত্তলী' শিরোনামে গল্প লিখে ফেলেন। এগুলো প্রকাশিত হতেই সাহিত্য মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। 'তারাশঙ্কর ফিরেছেন' বলে চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে তাঁর হারানো মানসিক শান্তিও ফিরে আসে।
১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই পশ্চিম বাংলার বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় মা প্রভাবতী দেবী ও বিধবা পিসিমা শৈলজা ঠাকুরাণীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদার সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন, আর মা ছিলেন শিক্ষা ও ধর্মশাস্ত্রের অনুরাগী। এই দ্বান্দ্বিক পরিবেশ তাঁর মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পড়ালেখায় তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন না; প্রথমবার ম্যাট্রিকে ফেল করে ১৯১৬ সালে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। কলকাতায় এসে সেন্ট জেভিয়ার্স ও সাউথ সাবআরবান কলেজে ভর্তি হলেও ভগ্নস্বাস্থ্য ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি।




