বিলাসিতা, শিল্প ও কল্পনার অসামান্য সমন্বয় দেখা যায় প্যারিস ওত কতুর উইকের র্যাম্পে প্রতি মৌসুমেই। তবে এবারের এই মঞ্চে ভিন্ন এক আবেগের গল্প লেখেন ভারতের জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রা। প্রথমবারের মতো প্যারিস ওত কতুর উইকে নিজের কতুর সংগ্রহ প্রদর্শন করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। সংগ্রহের নাম ‘মা’— যা শুধু পোশাক প্রদর্শন নয়, বরং মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতার শিল্পিত রূপ।
মনীশ মালহোত্রার শৈশবের স্মৃতি থেকে জন্ম নিয়েছে এই সংগ্রহ। সত্তরের দশকে তাঁর শৈশব ছিল মায়ের শাড়ির রঙে রঙিন। আশির দশকে ফ্যাশনের জগতে পা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর মা। ডিজাইনারের ভাষ্যমতে, তার মা কখনো সাফল্যের নিশ্চয়তা চাননি; শুধু নিঃশর্ত বিশ্বাসটুকুই ছিল তার সঙ্গী। সেই বিশ্বাসই তাঁকে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে— আর সেই অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘মা’ সংগ্রহের প্রতিটি নকশায়।
প্রতিটি পোশাকে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সূক্ষ্ম ছাপ ছিল নজরকাড়া। জারদৌজি, হাতে করা সূচিশিল্প, সূক্ষ্ম সুতোয় নকশা ও বিলাসবহুল কাপড়ের ব্যবহার পোশাকগুলোকে রাজকীয় আবেদন দিয়েছে। স্কাল্পচার সিলুয়েট, ঢেউ খেলানো ড্রেপ ও নিখুঁত অলঙ্করণ একসঙ্গে তৈরি করেছে এমন এক কতুর ভাষা, যেখানে আধুনিক নকশার সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্য স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে। রঙেও ছিল আবেগের ছোঁয়া— জেমস স্টোনের রঙ, কোমল প্যাস্টেল শেড ও ঝলমলে ধাতব আভা। প্রতিটি রং যেন মাতৃত্বের ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির প্রতীক: কখনও কোমল, কখনও শক্তিশালী, আবার কখনও আশ্রয়ের মতো নিরাপদ।
শুধু পোশাক নয়, পুরো শো-ই ছিল একটি শিল্পনির্ভর অভিজ্ঞতা। নরম সোনালি আলো, গাঢ় লাল র্যাম্প ও আত্মবিশ্বাসী মডেলদের উপস্থিতি প্রতিটি লুককে আলাদা গল্পে পরিণত করেছে। সংগীতে ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সুরের সঙ্গে আধুনিক অর্কেস্ট্রার মেলবন্ধন। ফলে দর্শক শুধু একটি ফ্যাশন শো নয়, বরং আবেগে ভরা একটি রানওয়ের অংশ হয়ে ওঠেন। সামনের সারিতে ছিলেন বিশ্ব ফ্যাশনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব অ্যানা উইনটর। তাঁর পাশেই ছিলেন ভারতের শিল্পপতি পরিবারের সদস্য ঈশা আম্বানি। তাঁদের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে ভারতীয় কতুর এখন আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
দীর্ঘদিন ধরে বলিউডের গ্ল্যামার, বিয়ের পোশাক ও ভারতীয় বিলাসবহুল ফ্যাশনের পরিচিত মুখ মনীশ মালহোত্রা। কিন্তু প্যারিস ওত কতুর উইকের ‘মা’ সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, ভারতীয় কারুশিল্প শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়— বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফ্যাশন মঞ্চেও এটি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সংগ্রহের প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি কারুকাজ ও প্রতিটি সিলুয়েটে ছিল স্মৃতি, ভালোবাসা ও উত্তরাধিকার বহন করার গল্প। ‘মা’ শুধু একটি সংগ্রহ নয়, বরং ভারতীয় ফ্যাশনের জন্য বিশ্বমঞ্চে এক আবেগঘন মাইলফলক।




