বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তথ্য বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ৩২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই উত্থানের ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্পের ব্যক্তিগত সম্পদ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু ৫৮ বছর বয়সী এই শীর্ষ নির্বাহী সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সৃষ্ট সম্পদের বৈষম্য ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

একটি পডকাস্টে এএক্সেল স্প্রিংগারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ডপফনারের সঙ্গে আলোচনায় কার্প বলেন, 'এই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এআই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে, কিন্তু এতে যারা জড়িত তারা তাদের বর্তমান সম্পদের ১০ গুণ বা ১০০ গুণ বেশি ধনী হয়ে যাবে। এটা সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।' তিনি আরও জানান, তার নিজের সম্পদ এআই-এর সুবাদে '২০ গুণ' বেড়ে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত কর্মীদের বেতন আগামী এক দশকে হয়তো কেবল দ্বিগুণ হবে বলে তিনি মনে করেন।

কার্প এই বৈষম্যকে 'অকল্পনীয় সম্পদ ও স্বাভাবিক সম্পদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা' হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, সমস্যা শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়, বরং কারা এই সম্পদ অর্জন করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, 'এটি করছে এমন মানুষ যাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই—অদ্ভুত আকারের আইকিউ-এর নমুনা, যাদের আপনি সম্ভবত রাতের খাবারে ডাকতে চাইবেন না। আর যদি তারা আসেও, তাহলে তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো কিছু থাকবে না, এবং উল্টোটাও সত্য।' কার্প আরও যোগ করেন, যারা এআই থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন, তারাই এর সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরছেন। 'এই দেশে এআই-এর অতিরঞ্জিত প্রচার সত্যিই কিছুটা উদ্বেগজনক, এবং হতাশাজনকও বটে, কারণ এটা করার কোনো প্রয়োজন নেই।'

আয়ের বৈষম্য বহু প্রজন্ম ধরে বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালে ধনকুবেরদের সম্পদ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ধনকুবেরদের সম্পদ ১৬ শতাংশের বেশি বেড়ে ১৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এই সম্পদ বিস্ফোরণের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলেন ইলন মাস্ক। টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহীর বর্তমান সম্পদ প্রায় ৮৩৩ বিলিয়ন ডলার, এবং তিনি এ বছরের শুরুর দিকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন। অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির যদি ১ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ থাকে, তাহলে তিনি ১০ শতাংশ সম্পদ কর দিলেও—প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার—পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে থাকবেন। এই ১০০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে এক বছরের জন্য চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।

শুধু কার্প নন, আরও অনেক শীর্ষ নির্বাহী এই বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী ল্যারি ফিঙ্ক, যার ব্যক্তিগত সম্পদ ১.৩ বিলিয়ন ডলার, সতর্ক করে বলেছেন, এআই-এর সুবিধা যদি কয়েকজন বিজয়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে বিশ্বের অনেক মানুষ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ফিঙ্ক বলেন, 'বার্লিন প্রাচীর পতনের পর থেকে মানব ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু উন্নত অর্থনীতিতে সেই সম্পদ মানুষের অনেক সংকীর্ণ একটি অংশের কাছে জমা হয়েছে, যা কোনো সুস্থ সমাজ দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না।' তিনি আরও বলেন, 'প্রাথমিক লাভ যাচ্ছে মডেলের মালিক, তথ্যের মালিক ও অবকাঠামোর মালিকদের কাছে। খোলা প্রশ্ন হলো—এআই যদি সাদা-কলার কর্মীদের সঙ্গে তা করে যা বিশ্বায়ন নীল-কলার কর্মীদের সঙ্গে করেছে, তাহলে বাকি সবার কী হবে? আমাদের আজই সরাসরি এ মোকাবেলা করতে হবে। এটা ভবিষ্যতের বিষয় নয়। ভবিষ্যৎ এখনই।'

নোবেল বিজয়ী কম্পিউটার বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টন, যাকে প্রায়শই 'এআই-এর গডফাদার' বলা হয়, একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'আসল ঘটনা হলো—ধনী লোকেরা এআই ব্যবহার করে শ্রমিকদের প্রতিস্থাপন করবে। এর ফলে ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি হবে এবং মুনাফা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এটি কয়েকজনকে আরও ধনী এবং বেশিরভাগ মানুষকে আরও দরিদ্র করে তুলবে। এটি এআই-এর দোষ নয়, এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দোষ।'

তবে জেপি মরগান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন এ বিষয়ে আরও সংযত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন। তিনি বৈষম্য নিয়ে কিছু বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও স্বীকার করেছেন, অনেক নিম্ন-আয়ের আমেরিকান কষ্টের মধ্যে রয়েছে। তিনি অ্যাক্সিওসকে বলেন, 'আপনি যদি গড় নাগরিক হন এবং বলেন, 'এই ধনী লোকেরা অবিশ্বাস্যভাবে ধনী হচ্ছে, আর এই অংশটি পিছিয়ে পড়েছে,' তাহলে সেটা বিরক্তিকর। আমরা আসলে নিম্ন-আয়ের মানুষদের পিছিয়ে ফেলেছি।'