মক্কার পবিত্র নগরীতে সম্প্রতি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব। গত ৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একত্রে জুমার নামাজ আদায় করেন। একই সঙ্গে তিন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। এই উন্মুক্ত ও উৎসবমুখর আয়োজনের বিপরীতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভ্যন্তরে একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে—বিশেষত সাবেক এক উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্যের মাধ্যমে।
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারাবাহিকতায় এই বৃহত্তর সমঝোতা গড়ে উঠেছে। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, কোনো এক সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে তা সকলের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক রূপায়ণ তিন দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তবে ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেন। গত শুক্রবার প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় দেশটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আবদুল্লাহ লেখেন, এটি ‘সময়ের এক অদ্ভুত পরিহাস’—যে দেশের এক-চতুর্থাংশ নাগরিক দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এবং এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিরক্ষর, সেই দেশই বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির একটি রাষ্ট্রকে রক্ষার ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থানে নিজেকে উপস্থাপন করছে।
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকালীন দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক শাসন, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস টেনে তিনি আরও বলেন, দেশটির একমাত্র প্রধান সক্ষমতা হলো তাদের কাছে থাকা ১৭০টি পারমাণবিক বোমা। তাঁর এই মন্তব্য মূলত পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সমঝোতার দিকে ইঙ্গিত করছিল, কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে আমিরাতের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিই প্রকাশ্যে এসেছে—বিশেষত পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া বৃহত্তর ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে কেন্দ্র করে।
আবদুল্লাহর পোস্টটি ১০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ১৬ লাখ পাকিস্তানি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করছেন; তাঁরা পাকিস্তানের প্রবাসী আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে এই মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এই পোস্টের জবাবে ইসেসকোর সাবেক প্রধান আবদুলআজিজ আলতোয়াইজরি ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন, যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়নবাদীদের সঙ্গে হাত মেলাবে, তারা কখনোই নিরাপত্তা খুঁজে পাবে না। পরবর্তীতে তিনি আরও যোগ করেন, ‘মনে হচ্ছে মক্কা চুক্তি সিনড্রোম আপনাকে দিশাহারা করে ফেলেছে।’ তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, মক্কা চুক্তিকে কেন্দ্র করে আমিরাতের কিছু মহলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, মক্কা চুক্তিকে মূলত ইউএই-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথম উপসাগরীয় দেশ হিসেবে আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও, মার্কিন চাপ সত্ত্বেও সৌদি আরব সেই পথ অনুসরণ করেনি। এছাড়া দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থনের কারণে সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের অবনতিও ঘটেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডোর সিঙ্গার মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, প্রথম দেখায় ইউএই-ইসরায়েল জোটকে উভয় পক্ষের জন্যই বেশি লাভজনক মনে হতে পারে। তবে দিন শেষে মক্কা চুক্তি আরও বড় পরিসরে এবং কোনো ধরনের বৈষয়িক লেনদেনের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর এই মূল্যায়ন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
গত মে মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চরম মুহূর্তে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আবুধাবি সেই বক্তব্য অস্বীকার করেছে। এই ঘটনাও আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের জটিলতা প্রকাশ করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের যুবরাজ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র নগরী মক্কায় একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, তিনটি দেশ প্রকাশ্যে এই চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কারণে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু ইউএই-ইসরায়েল জোটের ক্ষেত্রে হয়তো এমন প্রকাশ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশ সম্ভব হবে না। এভাবে, একদিকে মক্কার মাটিতে নতুন এক নিরাপত্তা বলয় গড়ে ওঠার আনন্দময় চিত্র, অন্যদিকে আমিরাতের সাবেক উপদেষ্টার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য—এই দুই বিপরীত দৃশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা তুলে ধরছে।




