ঘাড়, কাঁধ ও হাতে ব্যথা বা অবশ অনুভূতি সাধারণত সার্ভাইক্যাল স্পন্ডেলাইসিস বা ঘাড়ের ডিস্কের সমস্যা বলে মনে করা হলেও চিকিৎসকেরা বলছেন, থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম (টিওএস) নামক একটি শারীরিক জটিলতাও এসব উপসর্গের কারণ হতে পারে। গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাকিব আল নাহিয়ান জানান, এই রোগটি সঠিক সময়ে শনাক্ত না করলে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং হাতের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
থোরাসিক আউটলেট বলতে কলার বোন (ক্ল্যাভিকল) ও প্রথম পাঁজরের মধ্যবর্তী একটি সরু পথকে বোঝায়। এই পথ দিয়ে হাতের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু (ব্রাকিয়াল প্লেক্সাস), ধমনি (সাবক্লেভিয়ান আর্টারি) ও শিরাগুলো (সাবক্লেভিয়ান ভেইন) অতিক্রম করে। কোনো কারণে এই পথ সংকুচিত হলে স্নায়ু বা রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে এবং থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোমের সৃষ্টি হয়।
এই সিনড্রোমের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। জন্মগতভাবে অতিরিক্ত একটি পাঁজর থাকা (ক্ল্যাভিকল রিব), ঘাড় বা কাঁধে আঘাত, দীর্ঘসময় ভুল ভঙ্গিতে বসে কাজ করা, কম্পিউটারে একটানা কাজ করা, বারবার মাথার ওপর হাত তুলে কাজ করা, এক কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন করা, কাঁধের চারপাশের পেশির অতিরিক্ত টান বা দুর্বলতা, স্থূলতা এবং গর্ভাবস্থার কারণে ভঙ্গির পরিবর্তন — এসব কারণে থোরাসিক আউটলেট সংকুচিত হতে পারে।
লক্ষণগুলো নির্ভর করে স্নায়ু না রক্তনালি বেশি চাপে রয়েছে তার ওপর। স্নায়ু আক্রান্ত হলে ঘাড়, কাঁধ ও হাতে ব্যথা, ঝিনঝিন বা অবশভাব, আঙুলে সুচ ফোটার মতো অনুভূতি, হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং জিনিস ধরতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। দীর্ঘক্ষণ হাত ওপরে তুললে এই উপসর্গ আরও বেড়ে যায়। অপরদিকে রক্তনালি আক্রান্ত হলে হাত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, হাত ফ্যাকাশে বা নীলচে হয়ে যাওয়া, হাত ফুলে যাওয়া, দ্রুত ক্লান্তি এবং নাড়ির স্পন্দন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়।
রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক ঘাড় ও কাঁধ পরীক্ষা করে হাতের শক্তি ও অনুভূতি যাচাই করেন। প্রয়োজনে এক্স-রে, নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি ও ইএমজি, আলট্রাসাউন্ড ডপলার, সিটি বা এমআর এনজিওগ্রাফি এবং এমআরআই করার সুপারিশ করা হয়।
এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কিছু সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। দীর্ঘক্ষণ মাথার ওপরে হাত তুলে কাজ না করা, কম্পিউটারের মনিটর চোখের সমতলে রাখা, প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর দুই মিনিটের বিরতি নিয়ে ঘাড় ও কাঁধের হালকা ব্যায়াম করা, এক কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন না করা, সোজা হয়ে বসা ও দাঁড়ানো, কুঁজো হয়ে কাজ করা এড়িয়ে চলা, খুব উঁচু ও শক্ত বালিশ ব্যবহার না করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা — এসব অভ্যাস থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম প্রতিরোধে সহায়ক। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।




