বাংলাদেশের নাট্যজগতের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ২০০৫ সালের ২৭ মার্চ বিশ্ব নাট্যদিবস উপলক্ষে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় দেশের থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। দীর্ঘ এই বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বিদেশি নাট্যচর্চার সঙ্গে পার্থক্য এবং নাটকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা দিক আলোচনা করেন।
প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের থিয়েটার আন্তর্জাতিক মানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? মজুমদার মনে করেন, শিল্পকলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচার বেশ দুরূহ, কারণ এর জন্য কোনো স্বীকৃত মানদণ্ড নেই। প্রতিটি দেশের থিয়েটার তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল, তাই এক দেশের নাটকের সঙ্গে অন্য দেশের নাটকের তুলনা করা ভাষার তুলনার মতোই জটিল। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি কেবল বাস্তব অবস্থা ও অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করবেন, গুণগত কোনো বিচারে যাবেন না। ভাষা না বুঝে কোনো দেশের দুই-তিনটি নাটক দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ইংরেজদের কাছ থেকে প্রসেনিয়াম বা গ্রুপ থিয়েটারের ধারণা পেলেও, উপনিবেশবাদের প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আমাদের দৃষ্টি থাকলেও, প্রতিবেশী আসাম বা মণিপুরের নাট্যচর্চা সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই বলেই তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় ১৫তম নাট্যোৎসবে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি জানান, সেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়, কিন্তু দর্শক সংকটের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হন। শারজার শাসক শেখ সুলতান বিন মোহাম্মদ আল কাসেমির পাণ্ডিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে নাটকের চমৎকার অবকাঠামো থাকলেও মূল নাট্যচর্চার অভাব রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে হাজারো নাট্যকর্মী নাটকের জন্য নিবেদিত হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই।
ইরানে পরপর দুইবার আন্তর্জাতিক থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে গিয়ে তিনি সেখানকার নাট্যচর্চার সাহসিকতা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন। ধর্মীয় বিধিনিষেধের মধ্যেও ইরানি নাট্যকর্মীরা যেসব বিষয় নিয়ে নাটক করেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। তেহরানের ড্রাম্যাটিক আর্ট সেন্টারের অধীনে চারটি থিয়েটার কমপ্লেক্স এবং একটি সিটি থিয়েটারে সাতটি ভিন্ন ধরনের মঞ্চ রয়েছে। তবে সেখানে নাটকের পাণ্ডুলিপি আগে অনুমোদন করাতে হয়। তিনি একটি চমৎকার প্রযোজনা 'কিসেস অ্যান্ড টিয়ার্স'-এর কথা উল্লেখ করেন, যা রাজনৈতিক কারণে তেহরানে আর মঞ্চস্থ হয়নি।
উন্নত বিশ্বেও ৮০ শতাংশ প্রশিক্ষিত অভিনেতা পেশাদার হওয়ার সুযোগ পান না বলে তিনি জানান। জার্মান সরকার নাটকে বিপুল ভর্তুকি দিলেও সব জায়গাতেই অনুদান কমে আসার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব জার্মানিতে অনেক থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রডওয়েতেও ব্যয়বহুল প্রযোজনার কারণে বাণিজ্যিক থিয়েটারের সংখ্যা কমছে।
বাংলাদেশের নাটকের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিটি প্রযোজনার পেছনে একটি লক্ষ্য থাকে—সামাজিক সমস্যা বা মানবিক সম্পর্কের বিষয়। এখানে নাটকের মাধ্যমে কিছু বলতে চাওয়া হয়, যা বাংলাদেশের নাটকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তিনি উল্লেখ করেন, ব্রেশটের নাটক এখন আর আগের মতো সমকালীন মনে হয় না, তবে শেক্সপিয়র, ব্রেশট, মলিয়েরের নাটক নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে চিরকালীন হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের নাটক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেমন স্বীকৃতি পায়নি, কারণ সেগুলো যথেষ্ট অনূদিত হয়নি।
প্রতিবেশী ভারতের নাট্যচর্চার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সত্তরের দশকের কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারের স্বর্ণযুগ থেকে আমরা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বাণিজ্যিক থিয়েটারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পড়ায় আমরা সৌভাগ্যবান। তবে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারে পেশাদারির ছাপ সুস্পষ্ট, যা আমাদের অর্জন করতে হবে। নান্দীকারের 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' প্রযোজনাকে তিনি বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করেন, যেখানে ৫০ জন শিল্পী নাচ, গান ও অভিনয়ে অসাধারণ দক্ষতা দেখান। তিনি স্বীকার করেন, আমাদের বাচিক অভিনয় কলকাতার চেয়ে পিছিয়ে, কারণ আমাদের হলে অ্যাকুয়াস্টিক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। জাতীয় নাট্যশালার নতুন দুটি থিয়েটার হল নাটকের গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদী।
পরিশেষে তিনি বলেন, বিদেশিরা আমাদের নাটকে পেশাদারির ছাপ দেখতে পান, কিন্তু এতে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। নাটকের শক্তিই সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। বিশ্বায়নের যুগে বড় রাষ্ট্রের সংস্কৃতির জোয়ার থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সংস্কৃতির শক্তিই অস্ত্র। আমরা বিদেশি নাটক করব যদি তার প্রাসঙ্গিকতা থাকে, তবে নিজস্ব চরিত্র বজায় রাখব। আমাদের নবনাট্যচর্চার বয়স ৩৪ বছর হতে চলেছে, এই ভরা যৌবনে বালখিল্যতা সাজে না। বিদেশ থেকে আমাদের শেখার প্রধান বিষয় হলো প্রযোজনায় পেশাদারি অর্জন ও কাজে নিষ্ঠা। ফরাসি নির্দেশক আরিয়ান নুশকিনের ভাষায় তিনি বলেন, 'নাটক, ওই তোমার হাত বাড়াও, আমাকে উদ্ধার করো।'




