একসময় বাবার কোলে থাকা এক সাধারণ শিশু আজ হিন্দি সিনেমার প্রথম কাতারের ব্যস্ততম নায়িকা। ছবিপ্রতি তাঁর নেওয়া পারিশ্রমিক বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১ কোটি টাকা। তিনি কিয়ারা আদভানি। আজ, ৩১ জুলাই, তাঁর জন্মদিন। এই উপলক্ষে তুলে ধরা হলো তার সংগ্রাম, সাফল্য, মাতৃত্ব এবং চলমান বিতর্কের গল্প।
মুম্বাইয়ে ১৯৯২ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া কিয়ারার আসল নাম ছিল আলিয়া আদনানি। চলচ্চিত্রের জগতে পা রাখার আগেই তিনি নাম পরিবর্তন করেন, কারণ ততদিনে আলিয়া ভাট বলিউডে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। কিয়ারার পরিবারের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি কোনো যোগ না থাকলেও অনেক তারকার সঙ্গে পারিবারিক সূত্র ছিল। শৈশব থেকেই অভিনয়ের টান অনুভব করতেন তিনি।
তবে তার যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৪ সালে ‘ফাগলি’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন কিয়ারা। এই ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও অভিনেত্রী হিসেবে নজর কাড়তে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে ‘এম.এস. ধোনি: দি আনটোল্ড স্টোরি’তে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবশালী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তবে আসল মোড় ঘুরে যায় ২০১৯ সালে সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা পরিচালিত ‘কবির সিং’-এর মাধ্যমে। ছবিতে প্রীতি চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে যান কিয়ারা। নারী চরিত্রের উপস্থাপনের তীব্র সমালোচনার পরও ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্য তাকে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি; ‘গুড নিউজ’, ‘শেরশাহ’, ‘ভুল ভুলাইয়া ২’, ‘সত্যপ্রেম কী কথা’র মতো ধারাবাহিক হিট ছবি তাকে প্রথম সারির অভিনেত্রী করে তোলে।
‘শেরশাহ’ ছবির শুটিং চলাকালীন সহশিল্পী সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন সম্পর্ক ব্যক্তিগত রাখলেও ২০২৩ সালে রাজস্থানের জয়সলমিরে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে রেকর্ড পরিমাণ মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে।
বিয়ের পরও একাধিক বড় বাজেটের ছবিতে কাজ করতে দেখা গেছে কিয়ারাকে। কিন্তু সন্তান জন্মদানের পর কাজের গতি অনেকটাই কমিয়ে আনেন তিনি। সদ্যজাত কন্যার প্রতি মনোযোগ দিতে বেশ কয়েকটি বড় কাজ থেকে নিজেকে সরিয়েও নেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান জীবনে ব্যক্তিগত ও পেশাদারি জগতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাটাই তার কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে।
গত বছর জুলাইয়ে স্বামী সিদ্ধার্থ মালোত্রার সঙ্গে প্রথম সন্তানের জন্মের সংবাদ প্রকাশ করেন কিয়ারা। কন্যাসন্তানের আগমনের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে তারা লেখেন, ‘আমাদের হৃদয় এখন পরিপূর্ণ। আমাদের পৃথিবী চিরতরে বদলে গেছে।’ এর পর থেকেই মাতৃত্বের নতুন এক অধ্যায়ে নিমজ্জিত আছেন তিনি।
কিন্তু এই যাত্রা যে কেবল আনন্দের ছিল, তা নয়। সম্প্রতি উদ্যোক্তা ও পডকাস্ট উপস্থাপক রাজ শামানির অনুষ্ঠানে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কিয়ারা। পোস্টপার্টাম অর্থাৎ সন্তান জন্মের পর নারীদের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তার আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‘পোস্টপার্টাম নিয়ে কেউ আলোচনা করে না। অথচ এ বিষয়ে অনেক বেশি কথা বলা দরকার। মা হওয়া মানে এক বিশাল পরিচয় সংকট। এটা সম্পূর্ণ এক নতুন জগত। আর সেই পরিস্থিতিতে নিজেকে সময় দেওয়া, নিজেকে মাফ করতে শেখা খুবই কঠিন কাজ।’
কিয়ারা জানালেন, নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার পুরো ছয় মাস লেগেছে। এ সময়ে তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে বলেছেন, নিজের প্রতি যেন একটু সহানুভূতিশীল থাকেন। তার মতে, ‘তুমি সবার জন্য এত বেশি করো যে নিজের সঙ্গে সংযোগটা ভুলে যাও। নিজের জন্য কী দরকার, সেটাও আর চিন্তা করা হয় না। পুরো জীবনই ছিল অন্যদের ঘিরে। কিন্তু সন্তান আসার পর প্রথমবারের মতো নিজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি আরও স্মরণ করেন, সন্তান জন্মের প্রথম কয়েক মাস বাচ্চার ঘুম, স্নান বা ডায়াপার বদলানো নিয়েই কেটে যায়। সেই মুহূর্তগুলোতে তাঁর একজন শ্রোতা প্রয়োজন ছিল, যে কোনো উপদেশ না দিয়ে কেবল তাঁর পুরো কথা শুনবে। অভিনেত্রী স্বীকার করেন, সেসময় অতি ক্ষুদ্র কারণেও তিনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন এবং অজস্র কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। মাতৃত্ব তাকে নিজের ভেতরের অজানা দিকগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বলেও জানান। তার কথায়, ‘৩৪ বছর পর আমি সীমারেখা টানতে জেনেছি। নিজের প্রতি নিরন্তর সমালোচনা বন্ধ করতে জেনেছি। ভয়কে গুরুত্ব না দিতেও জেনেছি। এই ছয় মাসে আমাকে নিজেকেই সব শেখাতে হয়েছে।’ মা হওয়ার পর একজন নারীর ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা ও জীবনবোধ সবই বদলে যায় বলে দৃঢ় বিশ্বাস কিয়ারার।
অন্যদিকে, পেশাদার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ‘টক্সিক’ সিনেমাটি। যশের বিপরীতে এই ছবির প্রচার শুরুর পর থেকেই সমালোচনা তৈরি হয়। প্রথমে টিজার, পরে ‘তাবাহি’ গানের রোমান্টিক ও ঘনিষ্ঠ কিছু দৃশ্য ভাইরাল হয়। সেসব দেখে সামাজিক মাধ্যমে একটি পক্ষ মন্তব্য করে যে, বিবাহিত ও একজন মায়ের এ ধরনের দৃশ্যে অভিনয় না করাই উচিত ছিল। এই বিতর্কে সহ-অভিনেতা বেনেডিক্ট গ্যারেট যুক্তি দেন যে, দুজনই পেশাদার অভিনেতা এবং যশও একজন বিবাহিত ও সন্তানের পিতা, অথচ শুধু কিয়ারাকেই আক্রমণ করা হচ্ছে। এই মন্তব্য সমাজমাধ্যমে ব্যপক সমর্থন পায়। জাতীয় পুরস্কারজয়ী নির্মাতা গীতু মোহনদাসের পরিচালনায় অ্যাকশন, আবেগ ও নাটকীয়তায় মোড়ানো এই ছবির প্রতি আগ্রহ তাই তুঙ্গে।
সম্প্রতি বম্বে টাইমসকে কিয়ারা বলেন, ‘টক্সিক’–এ কাজ ছিল তার জন্য একেবারেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে পরিচালকের অনন্য নির্দেশনা তাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। ‘গীতু আমাকে সাফ বলে দিয়েছিলেন, সেটে এসেই যেন সম্পূর্ণ চরিত্রে ডুবে যাই,’ জানান তিনি। সাধারণত সেটে সবার সঙ্গে হাই-হ্যালো বিনিময় করা এই অভিনেত্রীর জন্য শুরুর দিকে এই নিঃসঙ্গ প্রক্রিয়া অস্বস্তিকর ঠেকলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন, চরিত্রের আবেগ ও মনোদশাকে নির্ভেজালভাবে ধরে রাখতেই এমনটা চেয়েছিলেন গীতু। কিয়ারা বলেন, ‘ধীরে ধীরে আমি উপভোগ করতে শুরু করি। এর ফলে চরিত্রের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করাটা সহজ হয়ে গিয়েছিল।’
শুধু মানসিক তৈরিই নয়, ভাষাগত দিক থেকেও ‘টক্সিক’ তার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ছবির বেশির ভাগ সংলাপ তিনি কন্নড় ভাষায় দিয়েছেন। ‘প্রথম বারের মতো আমরা একই দৃশ্য ইংরেজি ও কন্নড়— দুই ভাষায় করেছি। প্রথমে ইংরেজিতে দৃশ্যটি ঠিক মতো করে তোলার পর আবার কন্নড়ে ধারণ করা হতো। কন্নড় তো আমার মাতৃভাষা নয়। ফলে প্রতিদিন ভোরের আগে রাতে সংলাপ কণ্ঠস্থ করতে হতো। উচ্চারণ ঠিক করার পাশাপাশি আবেগ একইভাবে ফুটিয়ে তোলার চাপ ছিল ভীষণ কঠিন,’ ব্যাখা দেন তিনি।
কাজের পাশাপাশি আর্থিক দিকেও কিয়ারা বলিউডের শীর্ষে। তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ কোটি রুপি। সিনেমা এবং ব্র্যান্ড ভেন্ডরমেন্ট তার আয়ের প্রধান উৎস। একটি ছবির জন্য ২১ কোটি টাকা নেওয়ার পাশাপাশি একটি ব্র্যান্ডের জন্য বিজ্ঞাপনে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নেন কিয়ারা আদনানি।




