ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ছয় মাস অতিক্রম করেছে। যদিও যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে, তবুও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধানের পথ উন্মোচিত হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার মেটাতে মার্কিন ভোক্তারা অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন। অপরদিকে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় দেশে ট্রাম্পকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই জটিল প্রেক্ষাপটে বুধবার ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে একটি নতুন ও ব্যাপক অভিযানের সূচনা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তেহরানকে যেকোনোভাবে সহায়তা প্রদানকারী কিংবা দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেকোনো রাষ্ট্রকে ‘ভয়াবহ’ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
ট্রাম্প বুধবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যে দেশ তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর অথবা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ করে দেবে, সেই দেশকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণাম ভোগ করতে হবে। তবে কী ধরনের নির্দিষ্ট শাস্তি আরোপ করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত বিবরণ দেননি। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও গত সপ্তাহে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মার্কিন নৌ-অবরোধের পাশাপাশি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই আরও জোরদার করবে। কয়েক মাস ধরে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে; এর উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ইরানের অর্থায়নের সকল পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ প্রত্যাখ্যান করার জন্য অভিযুক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, চুক্তির জন্য তাঁর চেয়ে বড় সুযোগ ইরানকে আর কেউ দেয়নি। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, বিমানবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, সামরিক কারখানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জাতীয় মুদ্রা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর মিত্রদের প্রতি ওয়াশিংটনের ইরান-বিচ্ছিন্নকরণ নীতিকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি হবে একটি ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা অর্থনৈতিক চূড়ান্ত জয়ের দিন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে অকার্যকর করে তুলবে এবং তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখবে।
তেহরানের সঙ্গে কূটনীতির সম্ভাবনা নিয়ে পরপর বেশ কয়েকটি দ্বন্দ্বমূলক সংকেত দেওয়ার পর ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ঘোষণা সামনে এসেছে। তেহরান তার অবস্থানে অনড় থেকে জানিয়েছে, তারা আলোচনা ও কূটনীতির জন্য প্রস্তুত; তবে কোনো দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা পরিচালনা করবে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আলোচনা মানে কখনোই আত্মসমর্পণ নয়। তাঁর মতে, তেহরান যেকোনো আলোচনায় অংশ নেবে, কিন্তু তা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে।
ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। আল-জাজিরা জানিয়েছে, তেহরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযানের এই ঘোষণাকে তারা ইরানের অবস্থান পরিবর্তনের সামান্য সম্ভাবনাও থাকা একটি পুরোনো চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মন্তব্য করেন, তথাকথিত ইকোনমিক ডি-ডে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সংকট—অর্থাৎ নজিরবিহীন ঋণের বোঝা ও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া সুদের খরচ—থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল মাত্র। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গরিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক ব্যর্থতার পথে এগোচ্ছে, যাকে তারা অর্থনৈতিক যুদ্ধ নাম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরান পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে—এমন প্রচার চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সকল মিত্রের কাছে সাহায্যের জন্য ভিক্ষা চাইছে। তাঁর মতে, সমস্যার মূল হলো ভুল হিসাব-নিকাশ; আর প্রতিটি ভুল পদক্ষেপে তারা নিজেদের জন্য আরও বড় ব্যর্থতা তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে। সামরিক সংঘাতে কোনো ফলাফল আসেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন; তাই এখন তারা পরবর্তী ব্যর্থতার নাম দিয়েছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ।




