মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স (এমসিইউ) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গল্পের পরিধি যতই বাড়িয়েছে, ততই সিনেমাগুলো দর্শকের আবেগের জায়গা থেকে দূরে সরে গেছে বলে অভিযোগ ছিল। মাল্টিভার্স, বিশ্ব ধ্বংসের হুমকি আর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেওয়ার ব্যস্ততায় সুপারহিরো গল্পগুলো একঘেয়ে হয়ে পড়েছিল। সেই পথ থেকে সরে এসে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ আবারও ফিরে গেছে স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে পরিচিত জায়গায়—সুপারহিরোর মুখোশের আড়ালে থাকা সাধারণ মানুষ পিটার পার্কারের কাছে। এই পরিবর্তনই সম্ভবত দর্শকদের মন জয় করেছে। বিশ্বব্যাপী মুক্তির ১০ দিনের মাথায় ছবিটি আয় করেছে ১.৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দেশেও সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই টিকিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে; টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে শো ‘সোল্ড আউট’ ছিল।
২০২১ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর শেষে পৃথিবী রক্ষার স্বার্থে নিজের অস্তিত্ব সবার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন পিটার। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের জাদুর কারণে স্পাইডার-ম্যানকে সবাই চিনলেও পিটারকে কেউ আর চেনে না। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেড (জ্যাকব ব্যাটালন) এবং প্রেমিকা এমজে’র (জেনডায়া) কাছেও সে এখন অপরিচিত। সেই ঘটনার কয়েক বছর পরের গল্প নিয়ে তৈরি ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’। এবারের গল্পে নেই তিন স্পাইডার-ম্যানের মিলন কিংবা পুরোনো ভিলেনদের প্রত্যাবর্তন। নিউইয়র্কের রাস্তায় অপরাধ দমনে ব্যস্ত পিটার, পুলিশকেও সহযোগিতা করছে সে। শহরবাসীর ভালোবাসা পেলেও তার ব্যক্তিগত জীবন প্রায় শূন্য। রাতে একা অ্যাপার্টমেন্টে বসে সে দূর থেকে নেড ও এমজে’র জীবন দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দীর্ঘদিনের এই একাকিত্ব তার শরীর ও ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে—মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন, এমনকি স্পাইডার-ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরই মধ্যে নিউইয়র্কে আবির্ভাব ঘটে এক রহস্যময় শত্রুর, যে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং এক শরীর থেকে অন্য শরীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। এই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ড্যামেজ কন্ট্রোলের কর্মকাণ্ড ও স্করপিয়নের উপস্থিতি।
এ সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি পিটার পার্কার চরিত্রটি। আগের সিনেমাগুলোর চঞ্চল পিটারকে এবার অনেক বেশি পরিণত ও নীরব দেখা যায়। পরিচয় হারানোর পর প্রিয়জনদের দূর থেকে দেখেও ফিরে না যাওয়ার কষ্ট টম হল্যান্ড খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সুপারহিরো চরিত্রের শারীরিক ভঙ্গি, অ্যাকশন ও আবেগের মধ্যে সারাক্ষণ থাকতে হওয়ায় চরিত্রটির পরিণত বয়সের জটিলতা সবসময় সমানভাবে ফুটে ওঠেনি। জেনডায়া অনেক বেশি স্বাভাবিক, তার অভিনয়ে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততা ও পরিণতবোধ। পিটারের সঙ্গে তার মুখোমুখি দৃশ্যগুলোতে তিনি দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। জ্যাকব ব্যাটালনের সহজাত অভিনয় এবং কমিক টাইমিং গল্পকে আবেগপ্রবণ হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচিয়েছে।
খলচরিত্রে স্যাডি সিঙ্কের জিন গ্রে সিনেমার বড় চমক। মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাকে স্পাইডার-ম্যানের জন্য ভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। তবে তাকে শুধু ভিলেন হিসেবে দেখানো হয়নি; তার আচরণের নানা পরিবর্তন, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কারণে দর্শকের মধ্যে তার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়। ব্রুস ব্যানার (মার্ক রুফালো) এবার পিটারের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। অন্যদিকে ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেল (জন বার্নথাল) ও ইয়েলেনা বেলোভা (ফ্লোরেন্স পিউ) তাদের ছোট কিন্তু প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে গল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।
পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্র্যাটন পিটার পার্কারের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক দ্বন্দ্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে গল্পের সেই আবেগপ্রবণ দিকটি শেষ পর্যন্ত গভীরভাবে দাগ কাটতে পারেনি। চিত্রগ্রাহক ব্রেট পাওলাকের কাজ প্রশংসনীয়; ১.৯০:১ আসপেক্ট রেশিওতে ধারণ করা ফ্রেমে ক্ল্যাসিক স্পাইডার-ম্যান কমিকের ছাপ রয়েছে এবং গাঢ় ভিজ্যুয়াল টোন পিটারের একাকিত্বের সঙ্গে মানানসই। অ্যাকশন দৃশ্য তুলনামূলক কম, তবে মিলিটারি ট্যাংকের সঙ্গে লড়াই, স্করপিয়নের সঙ্গে সংঘর্ষ ও দ্য হ্যান্ডের নিনজাদের সঙ্গে মারামারি উপভোগ্য। মাইকেল জ্যাকিয়ানোর আবহসংগীত আবহ তৈরিতে কার্যকর।
তবে সিনেমার বড় দুর্বলতা হলো সমন্বয়হীনতা। প্রায় আড়াই ঘণ্টার গল্পে পিটারের একাকিত্ব, নতুন শত্রু ও ক্ষমতার পরিবর্তন একসঙ্গে এসে গল্পের গতি কিছু জায়গায় ধীর করে দিয়েছে। কয়েকটি সাবপ্লট মূল গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মিশতে পারেনি। ভবিষ্যতের সিনেমার জন্য আগেই গল্পের জায়গা তৈরি করে রাখার মার্ভেলের পরিচিত প্রবণতাও এখানে দেখা গেছে। একদিকে সিনেমাটি মাল্টিভার্সের জটিলতা থেকে বেরিয়ে পিটারের ব্যক্তিগত গল্পে ফিরতে চেয়েছে, অন্যদিকে এমসিইউ-এর গতানুগতিক দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
‘নো ওয়ে হোম’-এর সাফল্য ও পাঁচ বছরের অপেক্ষার পর প্রত্যাশা ছিল বিশাল। কিন্তু সেই তুলনায় গল্প ও নির্মাণ অনেকটাই পরিচিত মনে হয়েছে। অভিনয়, ভিজ্যুয়াল ও অ্যাকশন ভালো হলেও ছবিটি স্পাইডার-ম্যানের সেরা সিনেমাগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারেনি। সব মিলিয়ে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ একটি উপভোগ্য সিনেমা, তবে নামের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুন হয়ে উঠতে পারেনি।




