গত ১২ জুলাই সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে শ্যালা নদীর তীরে একটি বাঘিনীকে বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা যেখানে চোরা শিকারির ফাঁদে আটকে পড়া বাঘকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে পুনরায় বনে অবমুক্ত করা হলো। তবে এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বছর ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জে শরকির খালের পাশে বাঘিনীটি ফাঁদে আটকে পড়ে। খবর পেয়ে বন বিভাগ ট্রাংকুইলাইজার গান দিয়ে তাকে অচেতন করে উদ্ধার করে এবং খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। কয়েক মাসের চিকিৎসা ও সেবার পর তাকে সুস্থ করে তোলা হয়।

অবমুক্তির আগের রাতে, ১১ জুলাই রাত তিনটায় বাঘিনীটিকে আবার ট্রাংকুইলাইজার দিয়ে অচেতন করে একটি ছোট খাঁচায় তোলা হয়। সকালে মোংলা জেটি থেকে দুটি লঞ্চ ছাড়ে—একটিতে বাঘিনীর খাঁচা, অন্যটিতে সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফটোগ্রাফার। দুপুর বারোটায় শ্যালা নদী ধরে আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম সেন্টারের পাশে পৌঁছালে সেখানে বন্য প্রাণী গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ও বন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চারপাশে তিন থেকে চারটি ড্রোন উড়ছিল এবং ইঞ্জিনের শব্দে পরিবেশ ছিল কোলাহলপূর্ণ।

বেলা একটার দিকে খাঁচার মুখ খুলে দেওয়া হয়। বাঘিনীটি প্রথমে বাইরে বের না হয়ে ভেতরেই ঢুকে পড়ে। পরে ওয়াইল্ড টিমের তিন সদস্য তাকে নামাতে সাহায্য করেন। তীরে নামার পর প্রাণীটি ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকে, শক্তভাবে দাঁড়াতে পারছিল না এবং প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। মিনিটখানেকের মধ্যেই এটি বনে ঢুকে যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এই দৃশ্য দেখা গেলে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী বাঘ অবমুক্ত করার সময় শান্ত ও নীরব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ড্রোন, উচ্চ শব্দ ও জনতার উপস্থিতি প্রাণীর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ২০০৮ সালে রাশিয়া এবং ২০২৪ সালে ভারতে বাঘ অবমুক্তের ঘটনায় প্রথমে একটি সফট রিলিজ এনক্লোজারে রেখে পর্যবেক্ষণ ও শিকার সক্ষমতা যাচাই করে তারপর ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল বলে জানান বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান।

বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, প্রথমে বাঘিনীটি কিছুটা দুর্বল ছিল, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর বনের ভেতর গিয়ে তার পায়ের ছাপ দেখা গেছে এবং সে প্রায় দেড়শ মিটার হেঁটেছে। তার মতে, ধীরে ধীরে চলৎশক্তি ফিরে আসছে। তবে আরও কিছুক্ষণ পর ছাড়লে ভালো হতো বলেও তিনি স্বীকার করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, বাঘিনীর বিচরণ এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যার মাধ্যমে তার খাপ খাওয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ওয়াইল্ড টিমের প্রধান নির্বাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বাঘিনীটিকে প্রায় ১০ ঘণ্টা খাঁচায় রাখা হয়েছিল কোনো খাবার বা পানি ছাড়া এবং ভ্যাপসা গরমের মধ্যে তাকে তাড়াহুড়ো করে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবু আশা করা যায়, সে এখন সবল হয়ে বনে বিচরণ করছে।