লিফটের দরজা খুললে অনেকে ভয়ে পিছিয়ে যান, আবার কেউ কেউ ছোট মাকড়সা দেখলেই চিৎকার করে পালান। এই সব ঘটনা অন্যদের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু যারা এতে ভোগেন তাদের জন্য এটি পুরোপুরি বাস্তব। ইচ্ছে করলেই তারা ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেন না। এই অস্বাভাবিক ও তীব্র ভয়ের নাম ফোবিয়া। ভয় মানুষের সহজাত একটি অনুভূতি যা বিপদ থেকে রক্ষা করে। তবে কোনো প্রকৃত বিপদ না থাকা সত্ত্বেও যদি নির্দিষ্ট কোনো জিনিস, প্রাণী, স্থান বা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয় এবং তা স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি আর সাধারণ ভয় নয়, বরং ফোবিয়ায় পরিণত হয়।
মজার ব্যাপার হলো, ফোবিয়ায় আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই জানেন যে তাদের ভয় অযৌক্তিক। তবুও তারা সেই ভয়কে থামাতে পারেন না। 'ফোবিয়া' শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'ফোবোস' থেকে। গ্রিক পুরাণে ফোবোস ছিলেন ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক। হাজার বছর আগের সেই কল্পিত চরিত্রের নাম আজ মনোবিজ্ঞানে একটি স্বীকৃত মানসিক অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চতার ভয় পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ ফোবিয়াগুলোর একটি। ছোটবেলায় অন্ধকার বা বজ্রপাতের ভয় খুব স্বাভাবিক এবং বেশিরভাগ শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে তা কমে যায়। কিন্তু ফোবিয়া ভিন্ন — এটি বছরের পর বছর স্থায়ী হতে পারে এবং চিকিৎসা ছাড়া সহজে দূর হয় না। বিশ্বের বহু বিখ্যাত মানুষও বিভিন্ন ফোবিয়ায় ভুগেছেন। তাই ফোবিয়া দুর্বলতা নয়, বরং একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
পৃথিবীতে ৫০০-এরও বেশি ধরনের ফোবিয়ার কথা নথিভুক্ত হয়েছে। কিছু ফোবিয়া পরিচিত, যেমন উচ্চতাভীতি, অন্ধকারের ভয়, সাপ বা মাকড়সার ভয়, বন্ধ জায়গায় থাকার ভয় বা বিমানে ভ্রমণের ভয়। তবে কিছু ফোবিয়া এতই অদ্ভুত যে প্রথমবার শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। যেমন মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে অনেকে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন — এই অবস্থার নাম নোমোফোবিয়া। আবার কেউ নাভি দেখতে ভয় পান। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, লম্বা শব্দের ভয়কে বলা হয় হিপোপোটোমনস্ট্রোসেসকুইপেডালিওফোবিয়া। বিদ্রূপের বিষয়, যারা লম্বা শব্দকে ভয় পান, তাদের জন্য এই ফোবিয়ার নামটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই ভয় তৈরি হয়? এর একক কোনো উত্তর নেই। শৈশবের কোনো ভীতিকর অভিজ্ঞতা মনের গভীরে ছাপ ফেলে। বহু বছর পরেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সেই আতঙ্ক ফিরে আসে। কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে একই ধরনের ভয় দেখা যায়। আবার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা মস্তিষ্কের কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্যও ফোবিয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
ফোবিয়া শুধু মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শরীরও প্রতিক্রিয়া দেখায়। হঠাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়, হাত-পা কাঁপে, ঘাম হয়, মাথা ঝিমঝিম করে। অনেকের ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় যে তারা প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেই ভয়ের কারণ এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কিন্তু সমস্যা হলো, যত বেশি এড়িয়ে যাওয়া হয়, ভয় ততই শক্তিশালী হয়।
সৌভাগ্যের বিষয়, ফোবিয়ার কার্যকর চিকিৎসা এখন বিদ্যমান। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এবং এক্সপোজার থেরাপি সবচেয়ে সফল পদ্ধতিগুলোর অন্যতম। এসব চিকিৎসায় ধীরে ধীরে মানুষকে নিরাপদ পরিবেশে নিজের ভয়ের মুখোমুখি হতে শেখানো হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও ব্যবহার করা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পরিবারের সহযোগিতা পেলে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
ভয় সবার জীবনেই আছে। কেউ ব্যর্থতাকে ভয় পায়, কেউ অন্ধকারকে, কেউ নতুন কিছু শুরু করতে। কিন্তু যখন সেই ভয় জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ফোবিয়া লজ্জার বা লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। এটি বোঝা, মেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াই সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। ভয়কে অস্বীকার করে নয়, তাকে বুঝেই জয় করা যায়।



