ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বেশ কিছু দাবি করেছেন, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি দাবি করেছেন, সামরিক সরঞ্জাম ফুরিয়ে যাওয়ার উদ্বেগ নেই, বরং মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। এই উদ্বেগের জন্য তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার নীতিকে দায়ী করেছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রাম্প বলেছেন, 'আমাদের কাছে প্রচুর গোলাবারুদ আছে, বিশেষ করে মাঝারি স্তরের সরঞ্জাম। বাইডেন ইউক্রেনকে অনেক অস্ত্র দিয়েছেন, কিন্তু আমাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আছে।' কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদমাধ্যম আগেই জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধ মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রের মজুত শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসছে। পেন্টাগনের এক নথি অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে ১০০টির বেশি ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দিলেও তার অধিকাংশই ছিল স্থলযুদ্ধের উপযোগী। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মেরিন কর্নেল মার্ক এফ কানসিয়ান বলেছেন, ইউক্রেনে পাঠানো জ্যাভলিন, টো ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান ও ট্যাংকের মতো অস্ত্র ইরান যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখছে না, কারণ সেখানে লড়াই হচ্ছে মূলত আকাশে।

বিপরীতে, ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে প্যাট্রিয়ট, টমাহক ও জেএএসএসএম-এর মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার মজুত দ্রুত কমছে। উদাহরণস্বরূপ, ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ২০০টি ব্যবহার করা হয়েছে, আর ৩ হাজার টমাহকের মধ্যে ১ হাজারের বেশি নিঃশেষিত। ইউক্রেনকে মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান সংকটের মূল কারণ নয়। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্পের বক্তব্যকে সমর্থন করে বাইডেন প্রশাসনের অস্ত্রসহায়তার কথা উল্লেখ করলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইউক্রেনে পাঠানো অস্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য পেন্টাগন ২০২৪ সালে তহবিল ব্যবহার করেছে এবং তা ইরান যুদ্ধে সমস্যা সৃষ্টি করেনি।

তেলের দাম নিয়ে ট্রাম্পের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'আজ তেলের দাম অনেক কমেছে।' সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লড়াই সাময়িক বন্ধ থাকায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এটি যুদ্ধ শুরুর আগের দামের চেয়ে এখনো প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্টের দাম ছিল ৭২ ডলার। এর আগের সপ্তাহে দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা ইঙ্গিত দেয় বাজার এখনো অস্থিতিশীল। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে আসবে।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ভিয়েতনাম, ইরাক ও কোরীয় যুদ্ধের তুলনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত একটি চার্টে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মূলত সঠিক হলেও পেন্টাগনের হিসাবের সঙ্গে সামান্য অমিল রয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যুদ্ধে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যা পেন্টাগনের তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। তবে তিনি তাঁর প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশের অভিযানে ৬০ জনের বেশি সেনা নিহত হওয়ার তথ্য বাদ দিয়েছেন। এছাড়া ভেনেজুয়েলা ও সিরিয়ায় তাঁর আমলের অভিযানে হতাহতের সংখ্যা চার্টে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প সীমিত সামরিক অভিযানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী বড় যুদ্ধের তুলনা করছেন, যা বিভ্রান্তিকর।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের অস্ত্র মজুত ও তেলের দামের দাবিগুলো সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে তা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়েছে।