১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে হারানোর আট বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর পরিবারে সেই শূন্যতা আজও অম্লান। প্রতিবছর এই দিনটি এলেই ফিরে আসে একসময়ের প্রাণবন্ত আয়োজনের কথা — কেক কাটা, পছন্দের খাবার রান্না, আর কাছের মানুষের পদচারণায় মুখরিত বাসভবন। এখন আর সেই সময় নেই, তবুও দিনটি বিশেষভাবে মনে রাখেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার, ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব ও মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব। তারা কেক কাটেন, তবে সেই আনন্দের মাঝেও লুকিয়ে থাকে গভীর বিষাদ ও অশ্রু।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন ছেলে তাজওয়ার, আর স্বামীর সঙ্গে সিডনিতে থাকেন মেয়ে সাফরা। ফেরদৌস আক্তার বাংলাদেশে কিছুদিন থাকেন, আবার সময় পেলে সন্তানদের কাছে গিয়ে সময় কাটান। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব যাই হোক, ১৬ আগস্ট এলে তিনজনের হৃদয়ে জেগে ওঠে একই মানুষের স্মৃতি — তাদের প্রিয় 'বাবুই'।
আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার জানান, সন্তানরা ছোট থাকাকালীন বাসায় জন্মদিনের আয়োজন হতো জমকালোভাবে। কেক কাটা হতো, তাঁর প্রিয় খাবার রান্না করা হতো। কিন্তু সন্তানরা বড় হওয়ার পর আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে স্টুডিও। সেখানে বন্ধুবান্ধব ও সংগীতশিল্পীদের নিয়ে কেক কাটতেন আইয়ুব বাচ্চু, চলত হইচই ও গানবাজনা। বাসায়ও সন্তানদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন খাবার, আর তাঁরাও প্রস্তুত থাকতেন কেক নিয়ে। তবে মায়ের মৃত্যুর পর জন্মদিনের সেই উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে। ফেরদৌস আক্তারের ভাষ্য, মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে ২০০০ সালে মা মারা যাওয়ার পর জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা প্রায় হারিয়ে যায়। চ্যানেল আইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে তবুও নিয়মমতো কেক কাটা হতো, কিন্তু আগের সেই প্রাণবন্ততা আর ছিল না।
বাবার সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। ছেলে-মেয়ে দুজনকেই গিটার বাজানো শিখিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ছেলে তাজওয়ারকে বাবার সঙ্গে মঞ্চে দেখা গেলেও মেয়ে সাফরার সঙ্গে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। বাবা 'বাবুই' নামে ডাকতেন সাফরা। তাঁর ভাষ্য, বাবা বাড়িতে থাকলে ছোট্ট একটি গিটার নিয়ে জ্যামিং করতে করতে ভিন্ন এক জগতে চলে যেতেন। গিটারই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা, যা তিনি মেয়েকেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সাফরা ও-লেভেলে পড়ার সময় বাবা তাঁর জন্য একটি গিটার কিনে এনে বলেছিলেন, একদিন তাঁরা একই মঞ্চে বাজাবেন। কিন্তু সেই একদিন আর আসেনি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে এই শিল্পীর প্রয়াণ ঘটে।
শিল্পীর অনুপস্থিতিতে জন্মদিনের কেক কাটার রীতি অব্যাহত আছে পরিবারে, তবে সেই সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতির বেদনা। আজও মা-সন্তানদের মধ্যে আলোচনায় আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ উঠলে সবার চোখে পানি চলে আসে। কেউ কেক কাটার পর নীরবে স্মৃতিতে ডুবে থাকেন, কারও চোখে পানি।
এদিকে এবারের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করে প্রকাশিত হচ্ছে 'উত্তরাধিকার' শিরোনামের একটি বিশেষ অ্যালবাম। এই অ্যালবামে তাঁর ২০টি জনপ্রিয় গান নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করছেন দেশের বিভিন্ন ব্যান্ড ও একক শিল্পীরা। দলছুট, আরবোভাইরাস, সোনার বাংলা সার্কাস, শুভযাত্রা, ক্যালিপসো, রকসল্ট, ডোপামিন ও এ কে রাহুলসহ অনেকে তাঁর গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সবগুলো গানের মাস্টারিং করেছেন ইকবাল আসিফ জুয়েল। শিল্পী চলে গেলেও তাঁর গান ও গিটার এখনো বেঁচে আছে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে। ভক্তদের ভালোবাসায় তিনি আজও চিরস্মরণীয়। আর পরিবারের কাছে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন ব্যক্তিগত স্মৃতি আর ভালোবাসার 'বাবুই' হয়ে। তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন, যা ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়।




