সমাজে জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে বিনোদন মাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ‘বিনোদনমাধ্যম ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশনের যৌথ প্রকল্প ‘সমতায় তারুণ্য’ এই আয়োজন করে। প্রচার সহযোগী ছিল প্রথম আলো। গত বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিনোদন মাধ্যমের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখন শুধু সিনেমা বা নাটকই নয়, সামাজিক মাধ্যমেও নানা ধরনের কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে যা মানুষের বিনোদনের অন্যতম উৎস। এই কনটেন্টে নানা সামাজিক সমস্যা যেমন নারীর প্রতি বিদ্বেষ, শ্রেণিগত বিভেদ, রাগ-ঘৃণা ইত্যাদি উঠে আসছে। তিনি মনে করেন, শুধু সরকারি আইন বা নীতিমালা দিয়ে এই প্রবণতা বদলানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের সার্বিক পরিবর্তন। সরকার সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে ভেতর থেকেই সব স্তরে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিনোদন মাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ পলিসি অ্যাডভাইজার (জেন্ডার অ্যান্ড সিভিল সোসাইটি) মাশফিকা জামান সাটিয়া বলেন, দৃশ্যমাধ্যম মানুষের মনোজগত পরিবর্তনে বড় প্রভাবক। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের পেছনে সরিয়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রসহ সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং পরিবার থেকেই এই কাজ শুরু করা জরুরি। তিনি বিনোদন মাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে বিষয়টি তুলে ধরার আহ্বান জানান।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, আমাদের চারপাশের দৃশ্য-শ্রবণ মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং মনোভঙ্গি তৈরি করে। তাই পরিবেশের পরিবর্তন জরুরি। তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্ল্যান তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে। সিনেমা-নাটকের মতো মাধ্যম ভাবনাচিন্তার ভিত্তি গঠনে গভীর প্রভাব রাখে।

জাগো ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক করভি রাকসান্দ বলেন, তরুণদের শুধু দর্শক হিসেবে না দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সৃজনশীল নির্মাণে তাদের সক্রিয় অংশীদার করতে হবে। সুযোগ ও আস্থা পেলে তারা দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করে। তাই ইতিবাচক ও সমতাভিত্তিক কনটেন্ট এবং সুস্থ বিনোদনচর্চায় তাদের আরও সুযোগ-স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।

নাট্যকার মাসুম রেজা বলেন, বিনোদন মাধ্যম জেন্ডার মনোভাব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে নির্মাতাদের মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীলতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও প্রচলিত কাঠামোর বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। বিনিয়োগ তুলে আনার চাপ থাকে। বর্তমানে ইউটিউব বা ফেসবুকে ‘ভিউ’ বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে, যার জন্য মানহীন কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার সচেতন প্রয়াস প্রয়োজন এবং সরকারিভাবে দিকনির্দেশনা থাকতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, জেন্ডার শুধু নারীর বিষয় নয়, এটি সামাজিক। বিনোদনে একই ধরনের গল্প বারবার দেখানো হয়, নারীকে ভোগের সামগ্রী ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়। এর পরিবর্তন জরুরি। প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল সমাজ ও সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

অভিনেতা খায়রুল বাসার বলেন, বিনোদন মাধ্যম সম্পূর্ণরূপে নারী-বিরোধী নয়। সাম্প্রতিক কালে নারীপ্রধান নাটক-সিনেমাও তৈরি হয়েছে, তবে সেগুলো তেমন আলোচিত হচ্ছে না। তাঁর নিজের অভিনীত ‘বনলতা সেন’, ‘রোদ বৃষ্টির গল্প’-এর মতো নাটক-চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, নারীদের সাহস ও সংগ্রামকে আরও সম্মান ও ন্যায্যতা দেওয়া প্রয়োজন।

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান মহাব্যবস্থাপক রাজু আলীম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নিম্নমানের কনটেন্ট থাকলেও বিটিভি, মূলধারার স্যাটেলাইট চ্যানেল বা চরকির মতো ওটিটি মাধ্যমে মানসম্মত কনটেন্ট প্রচার হয়। ভালো কনটেন্ট ‘ভিউ’ ব্যবসার বাইরেও দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করতে পারে।

চলচ্চিত্র প্রযোজক মোকাররম হোসেন বলেন, বিনোদন বাজার বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। আর্থিক দিক থেকে বাজার ছোট এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরিবর্তনের মানসিকতা থাকলেও গ্রহণযোগ্য করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণেরা এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথম আলোর বিনোদন বিভাগের প্রধান মাসুম অপু বলেন, জেন্ডার সংবেদনশীলতা ভাষার বিষয় নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত দায়িত্বের বিষয়। তাঁরা চেষ্টা করেন শিল্পী যেন জেন্ডার পরিচয়ের জন্য নয়, বরং শিল্পকর্মের জন্য মূল্যায়িত হন।

বৈঠকের শুরুতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (আইসিসি) নিশাত সুলতানা ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্ল্যানের পরিচালক (প্রোগ্রামস) মাহিন নেওয়াজ চৌধুরী। আলোচনায় আরও অংশ নেন প্ল্যানের জেন্ডারবিষয়ক উপদেষ্টা সানজিদা আহমেদ, বাংলাদেশ ইয়ুথ কোয়ালিশনের সেক্রেটারিয়েল ফোকাস সাদিয়া আফরিন, ভৈরবীর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস নবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাবণ্য প্রজ্ঞা। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।