ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের লক্ষ্যে দেওয়া আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি থেকে ক্রমশ সরে আসছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটি ভোটের আগে যে সব প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোর বাস্তবায়নে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি—এই তিন রাজ্যের উদাহরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে ডোল বা দান-খয়রাতের পরিমাণ কমানোর দিকেই মনোযোগী বিজেপি। রাজ্যগুলোর বাজেট ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি কোষাগারের চাপ কমাতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

দিল্লির প্রসঙ্গে বলা যায়, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে 'দিল্লি লক্ষ্মী যোজনা' আগামী ২৮ আগস্ট থেকে চালু হবে। কিন্তু আগের আমলে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সময় চালু হওয়া 'মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা' থেকেও এই প্রকল্প অনেকটাই ভিন্ন। নতুন প্রকল্পের আওতায় সরকারি পেনশনভোগী, আয়করদাতা পরিবার, সরকারি কর্মচারী পরিবার, যাদের বার্ষিক আয় আড়াই লাখ রুপির বেশি, এবং যাদের চার চাকার গাড়ি আছে—এমন সব পরিবারকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। পরিবারে একাধিক নারী থাকলে শুধু বয়োজ্যেষ্ঠ নারীই এই সহায়তা পাবেন। আবেদনকারীকে দিল্লিতে অন্তত ১০ বছর বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে এবং পরিবারের কারও বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড থাকলেও তারা বাদ পড়বেন। দিল্লির বাজেটে এ বছরের জন্য এই প্রকল্পে ৫১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ থাকলেও, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অপর দিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার 'অন্নপূর্ণা ভান্ডার' প্রকল্প এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারেনি। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে এটি প্রতি মাসে নারীদের তিন হাজার রুপি করে সহায়তা দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আবেদন প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। ১২ পৃষ্ঠার একটি ফর্ম চালু করা হয়েছিল, যাতে পরিবারের সব সদস্যের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হচ্ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই ফর্ম প্রত্যাহার করে নতুন ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এই প্রকল্প থেকেও আয়করদাতা, কেন্দ্র-রাজ্য সরকারি কর্মী, পেনশনভোগী এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে। তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে বহু পুরুষের নাম পাওয়া গেছে যারা এই সহায়তা পাচ্ছিলেন, তাদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে। যাদের ভোটার তালিকায় নাম নেই বা এসআইআরে বিচারাধীন ২৭ লাখ নাম, তারাও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।

মহারাষ্ট্রে বিজেপি সরকারের 'মাঝি লড়কি বহিন' প্রকল্পের কথা ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুনে চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের মাসে দেড় হাজার রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। সম্প্রতি রাজ্য সরকার সুবিধাভোগীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৯২ লাখ গ্রহীতাকে বাদ দিয়েছে। যে পরিবারের কেউ আয়কর দেন, কেউ সরকারি চাকরি করেন, বা যে পরিবারে একাধিক নারী সাহায্য পাচ্ছিলেন—তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। একাধিক সদস্যা থাকলে শুধু বয়োজ্যেষ্ঠ নারীই পাবেন। এছাড়া তালিকায় ১৪ হাজার পুরুষের নাম পাওয়া গেছে, তাদেরও সরানো হয়েছে। ফলে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৪৩ লাখ থেকে নেমে এসেছে ১ কোটি ৫০ লাখে।

বোঝা যাচ্ছে, ভোটে জিততে নারীদের জন্য ঢালাও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সেটি বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। দলটি এখন 'প্রয়োজন' ও 'অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা'র যুক্তি দিয়ে সুবিধার পরিধি সীমিত করছে। যদিও বিরোধীরা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছে এবং সাধারণ নারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তবুও সরকার নিজের পথে অটল রয়েছে। নীতীশ কুমারের 'লক্ষ্মী ভান্ডার' ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' প্রকল্পের মতো জনপ্রিয় প্রকল্পের ধাঁচে তৈরি হলেও বিজেপির এই প্রকল্পগুলো এখন কঠোর নিয়মের কারণে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দান-খয়রাতের রাজনীতিতে রাশ টেনে বিজেপি মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক সংস্কারের পথেই হাঁটছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।