বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় থাকা রোহিঙ্গারা মানব পাচারের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বুধবার (৩০ জুলাই) জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছেড়ে আসা দুটি নৌযান দেশটির উপকূলে ডুবে গেছে। ওই নৌযান দুটিতে ৫০০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থীশিবির থেকেও যাত্রা শুরু করেছিলেন বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ২০২৫ সালে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পাড়ি দিয়েছেন। এদের মধ্যে আনুমানিক ৯০০ জন মারা গেছেন। সমুদ্রপথে যাত্রা করা এসব মানুষের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন নিখোঁজ হন বা মারা যান। বিশ্বের শরণার্থী ও অভিবাসীদের ব্যবহৃত সমুদ্রপথগুলোর মধ্যে এই পথেই মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। তাদের জন্য নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সীমিত। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবিকার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তারা মানব পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু ও তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শরণার্থী শিবিরে থাকা নারী ও কন্যাশিশুরা পাচার এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চরম ঝুঁকির মুখে। প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

তারা আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের এই সুযোগ-সুবিধার অভাবকে পুঁজি করে মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্র রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করছে। চাকরি, শিক্ষা বা বিয়ের ভুয়া প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাচার করা হচ্ছে। এমনকি নিজেদের দলে টানতে বা ব্যবহার করতেও তাদের পাচার করা হয়।

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুসহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কয়েক দিন পর্যন্ত থানায় আটকে রাখা হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার মতো চরম মানসিক আঘাত পাওয়ার পরেও তারা আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা বা চিকিৎসাসেবা পান না। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা দিয়ে থাকে মানবিক সংস্থাগুলো। তবে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া তহবিলে বড় ধরনের কাটছাঁট হওয়ায় এসব সংস্থার সক্ষমতাও কমে গেছে।

মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জেন্ডার সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রাধান্য দিয়ে সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রাষ্ট্রহীন অবস্থার অবসান ঘটানো এবং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাফেরার স্বাধীনতা ও সার্বিক সুরক্ষা সেবার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এসব বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। এই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন নারী ও শিশু পাচারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার সিওভান মুল্যালি, অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার জেহাদ মাদি এবং নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি ক্লদিয়া ফ্লোরেস, সহসভাপতি ইভানা ক্রটিচ, ডরোথি এস্ত্রাদা-ট্যাঙ্ক, হাইনা লু ও লরা নিরিনকিন্দি।