ছোটবেলা থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের দুই মহারথী উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন সুইডেনের ওষুধ প্রতিষ্ঠান ফাইজারের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা। সম্প্রতি হঠাৎ করে সুচিত্রী সেন ও উত্তম কুমারের শেষ দেখা নিয়ে একটি লেখা তাঁর চোখে পড়লে, পুরোনো দিনের এক অনির্বচনীয় স্মৃতি তাঁর মনে ভেসে ওঠে।
টলি গঞ্জের মহানায়িকা খ্যাতির চরম শিখরে থাকলেও, ব্যক্তি পিছনে ছিলেন এক নিঃসঙ্গ মানুষ। অভিনয় জগতের আলোর আড়ালে থাকা অন্ধকার তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতেন। সম্ভবত এই কারণেই তিনি কখনোই চাননি তাঁর কন্যা মুনমুন সেন চলচ্চিত্রে আসুন। উত্তম কুমার-সুচিত্রী সেনের জুটি ছিল একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের হৃদয়। উত্তম কুমারের মৃত্যুতে সুচিত্রী সেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। এক সাক্ষাৎকারে একে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, “স্টারদের ক্রিকেট খেলার সময় ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল। আমায় দেখে হেসেছিল। কিন্তু ওর চোখে যে ক্লান্তি দেখলাম, তা বলে বোঝানো যাবে না। জানতে চাইলে বলেছিল, ‘ভালো আছি’।” আর এটাই ছিল এক নক্ষত্রের শেষ উক্তি।
নিজের সেই ব্যক্তিগত গল্পের কথা বলতে গিয়ে রহমান মৃহা জানান, ১৯৮৭ সাল নাগাদ তিনি সুইডেন থেকে বাংলাদেশ যাচ্ছিলেন। স্টকহোম থেকে বেলগ্রেড হয়ে কলকতা, তারপর ঢাকা। আজকের দিনে এ রকম ভ্রমণের কথা ভাবলেও গা শিউরে উঠলেও, তখন ছিল এক দুঃসাধ্য ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ফেরার পথে ঢাকা হয়ে দমদম বিমানবন্দরে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। চারপাশে নিস্তদ্ধতা আর ভাসছিল ইউরোপের সেই বিখ্যাত গান "দ্যা ফাইনাল কাউন্টডাউন"। ঠিক সে সময়ই তিনি এক নারীকে দেখতে পেলেন, যাঁর উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ রাজকীয়। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন সুচিত্রী সেনেরই প্রতিচ্ছবি। সময়ের ভাঁজ পড়লেও একই আভিজাত্য ছড়িয়ে যিনি এসে তার খুব কাছে বসলেন।
তিনি জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি বেলগ্রেড যাচ্ছেন কিনা। উত্তর পেলেন, হ্যাঁ, কিন্তু তার পরবর্তী গন্তব্য জার্মান, যেখানে একটি বিশেষ কাজ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় তিনি তার ভক্তত্বের কথা প্রকাশ করেননি। বরং সাধারণ যাত্রীর মতোই তিনিও তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলেন— কোথায় যাচ্ছেন, প্রথমবার বিদেশ যাচ্ছেন কি না ইত্যাদি। ফ্লাইটের সময় হলে তারা বিমানে উঠলেন এবং বিস্ময়করভাবে সেই নারী তার ঠিক সামনের আসনে বসলেন। যাত্রা পথে আবারও কিছু সাধারণ কথাবার্তা হলো। রহমান মৃহা জানান, বিদেশে যাওয়ার সময় তাঁর মন সাধারণত গভীর হলেও, সেদিনকার অনুভূতি ছিল একেবারে আলাদা। বিদায়ের সময় তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। সেই হাত ধরে রহমান মৃহা অনুভব করলেন, এটি কোনো সাধারণ মানুষের হাত নয়, বরং এটি একটি পুরো যুগের প্রতীক। আজও সেই সংবেদনা তার স্মৃতিতে অমর হয়ে আছে।
শেষে তিনি মন্তব্য করেন, উত্তম কুমার এবং সুচিত্রী সেন কেবল অভিনেতাই নন, তারা বাঙালির যৌথ সাংস্কৃতিক আবেগের প্রতীক। তাদের অভিনয় ছিল সংযমের মধ্যে প্রগাঢ়তা, সৌন্দর্যের মধ্যে গভীরতা এবং জনপ্রিয়তার মাঝে এক নীরব শৃঙ্খলা। এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিই নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবিয়ে তোলে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এখানে প্রতিভা, গল্প ও দর্শকের ভালোবাসার ঘাটতি নেই। তবে শৈল্পিক পরিমিতি, চরিত্রের গভীরতা এবং নির্মাণের ধৈর্য এখনো আরও মজবুত হওয়ার অপেক্ষায়। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আরও সমৃদ্ধ হবে, নিজের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আত্মবিশ্বাসে ধারণ করে এগিয়ে যাবে। কারণ চলচ্চিত্র শুধু পর্দায় দেখার বস্তু নয়, এটি একটি দেশের আত্মপ্রকৃতি, স্মৃতি, ব্যথা ও স্বপ্নের সমন্বিত রূপ।




