পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও তার জাদু যে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি, তার প্রমাণ মিলল শুক্রবার সন্ধ্যায়। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেম প্রাঙ্গণে ছিল ব্যান্ড ওয়ারফেজের বিশেষ আয়োজন 'প্লেলিস্ট ট্রিবিউট টু অরিজিনালস', যা ছিল পুরোপুরিই মাইকেল জ্যাকসনকে উৎসর্গ করা। অনুষ্ঠান শুরুর বেশ আগে থেকেই মিলনায়তনের বাইরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। দেয়াল জুড়ে পোস্টার ও কাটআউট, নানা অ্যালবাম ও গানের তালিকা—সব মিলিয়ে পরিবেশটিই হয়ে উঠেছিল মাইকেলময়। তরুণ দর্শকেরা নিজেদের মোবাইলে রিলস বানানো ও ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী কন্টার্ট শুরু হওয়ার কথা সন্ধ্যা ৬টায় হলেও তা পিছিয়ে ৭টা নির্ধারিত হয়। পরিশেষে ঠিক ৭টা ১০ মিনিটে মূল আয়োজন উদ্বোধন হয় এক ব্যতিক্রমী উপস্থাপার মাধ্যমে। মিলনায়তনের সকল বাতি নিভে যাওয়ার পর মূল মঞ্চের পর্দায় ভেসে ওঠে পপতারকার একটি অ্যানিমেশন। এরপর আলো বাড়তে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় মাইকেলের বিখ্যাত নাচের ভঙ্গিতে আবির্ভূত এক শিল্পীকে। পুরো হাতালি ও উত্তেজনাপূর্ণ শব্দের মধ্যে মঞ্চে হাজির হয় দর্শক প্রতীখ্যার ব্যান্ড ওয়ারফেজ।
প্রথম গান হিসেবেই বেজে উঠে কিংবদন্তি 'বিলি জিন'। দলটির কণ্ঠশিল্পী পলাশ নূরের সূচনা দর্শকদের মন্দগ্র বিলম্বের সমস্ত বিরক্ত দূর করে দেয়। এরপর একে একে বাজতে থাকে 'ইউ আর নট অ্যালোন', 'ব্ল্যাক অর হোয়াট', 'দে ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট আস', 'হিউম্যান নেচার', 'বিট ইট', 'ব্যাড' ও 'থ্রিলার'-এর মতো জনপ্রিয় গান। সব মিলিয়ে ১৬টি গানে ওয়ারফেজ তাদের অসাধারণ পরিবেশনায় আসর জমিয়ে দেয়। পলাশ নুর চমৎকার গলার জোর প্রদর্শন করে প্রতিটি গানেই আদি সুরের পরিবেশ নির্মাণ করেন। এই পুরো আয়োজনে নতুনত্ব এনে দেন কণ্ঠসিল্পী ওয়াহিদা হোসাইন। 'ব্যাড গার্ল' গানটি তিনি উচ্চাঙ্গের নিখুঁত উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের মন্ত্রমুদ্ধ করে রাখেন। এ ছাড়াও ব্যাক ভোকাল হিসেবে তোরসা, অন্ তারা ও তাসফির নিজেদের পারফরমেন্স দিয়ে সকলের নজর কাড়েন।
শ্রুদের দিকে ওয়ারফেজ নিজেরা বেশ কটি গানের যন্ত্র সংগীত বাজালেও পরবর্তী অংশে মূল গানের অডিও ট্র্যাকটি ব্যবহার করা হয়। পুরো সময় জুড়ে একটি বড় পর্দা ছিল, যা তৈরি করা হয় পুরোনো দিনের টেলিভিশনের ডিজাইন দিয়ে, যা পুরো আয়োজনকে দিয়েছিল একটি নস্টালজিক ও রেট্রো আবহ। প্রতিটি গান পরিবেশের সময়ে মাইকেল জ্যাকসনের মতো পোশাক পরা কিছু দৃশ্য় শিল্পী মঞ্চের সামনে নৃত্য পরিবেশন করেন। কখনও তারা পপসম্রাটের মিউজিক ভিডিওর গল্প পুনঃনির্মাণের প্রচেষ্টা চালান। নৃত্যশিল্পী উজ্জ্বল ও হিমুর পরিবেশনা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। একটি গানে বান্দরবানের 'বেসিক গিটার লার্নিং স্কুল'-এর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানেরে বৈচিত্র্য এনেছিল।
রাত ৯টায় কনট্র সমাপ্ত হয় মাইকেল জ্যাকসন ও লিওনেল রিচির লেখা 'উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড' গানটির মধ্য দিয়ে। ১৯৮৫ সালে আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় তহবিল গড়ার জন্য তৈরি এ গানটি যখন পরিবেশিত হয়, তখন সব ভেদাভেদ ঘুচে উপস্থিত পুরো দর্শক একত্রে কলাতে। এদিন সকল শিল্পীই বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিশ্চলে উপস্থিত হন, যা তৈরি করে এক অপরূপ দৃশ্য।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৯২ সালের এই দিনে মাইকেল জ্যাকসন তার বিখ্যাত 'ডেঞ্জারাস ওয়ার্ল্ড ট্যুর'-এর অংশ হিসেবে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এক অবিশ্মরণীয় প্রদর্শনী করেছিলেন। সেই দিনেই রাজধানী ঢাকায় এক অভিন্ন রীতিতে তিনি ফিরলেন। আসলে ২০২৬ সালটি যেন এক 'মাইকেল বর্ষ'। তার জীবনীমূলক চলচ্চিত্রটি কিছুদিন আগেই বিশ্বব্যাপী বক্স অফিস থেকে ১০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এক ভক্ত যখন অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে 'বিট ইট' গাইতে গাইতে ছুটন্ত বাসের দণ্ড ধরে ফেলেন, তখন পরিষ্কার হয়ে যায়—মৃত্যুর এত বছর পরেও দেশ ও সমাজের গন্ডি ভেদ করে ভিন্নভাবে কতটা প্রাসঙ্গিক মাইকেল জ্যাকসন।




