ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান ভয়াবহ দাবানলের কারণে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ থেকে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শক্তিশালী বাতাসের কারণে পর্যটন রিসোর্ট ও গ্রামগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

রেথিমনো এলাকা থেকে রাতারাতি প্রায় ৮ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটারে পৌঁছেছিল। বুধবার ক্রিয়া ভ্রিসির কাছে আগুনে আটকা পড়ে দুই দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া পেলোপোনিজের গিথিও বন্দর শহরের কাছে আরও একজন দমকলকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

ক্রিটের পশ্চিমাঞ্চলের রেথিমনোতে বুধবার সকালে এই দাবানলের সূত্রপাত হয়। এটি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বাড়ি ও কৃষিজমি ধ্বংস করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপটিতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় দাবানলগুলোর মধ্যে এটি একটি, যার সামনের অংশ ১৫ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এবং এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

রেথিমনোর উপ-আঞ্চলিক গভর্নর মারিয়া লিওনি জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, আগুন এখনও জ্বলছে এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করাই প্রধান অগ্রাধিকার। বুধবারকে তিনি এই অঞ্চলের জন্য 'অন্ধকার দিন' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, রাতের বাতাসের গতিবেগ বিউফোর্ট স্কেলে ১১ এ পৌঁছেছিল, যা 'ভয়ঙ্কর' হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

দমকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শক্তিশালী বাতাস আগুনকে উসকে দিচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত করছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে দমকল বিমান উড়তে পারেনি। লিওনি জানান, রেথিমনোতে উচ্ছেদ হওয়া কিছু লোককে পার্শ্ববর্তী পৌরসভায় অস্থায়ী আশ্রয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে এবং পর্যটকদের জন্যও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জুলাই মাস ক্রিটে পর্যটকদের ব্যস্ততম মাসগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসেন।

দেশটির দমকল বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলে প্রায় ২২৪ জন দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৩টি ইঞ্জিন, ১১টি বিশেষ ইউনিট এবং দুটি বিমান রয়েছে। গ্রিক দমকল প্রধান থিওডোরোস ভাগিয়াস নিহত দুই দমকলকর্মীর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের নাম প্রকাশ করেন — ৫৮ বছর বয়সী এমমানুইল স্ট্রাটিডাকিস এবং ২৫ বছর বয়সী পান্টেলিস ডায়ামান্টাকিস। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বৃহস্পতিবার তাদের উভয়কে সমাহিত করা হবে।

এদিকে, স্পেনের জামোরা শহরে পর্তুগালের সীমান্তের কাছে দাবানলের কারণে প্রায় ৬০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পর্তুগালের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভালপাকোসে আগুনে পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছে দাবানল ছড়ানো বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজার হাজার বাসিন্দাকে বাড়ি ফিরতে দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিম দিকে, আভিলা প্রদেশের একটি দাবানল গত সপ্তাহে ৪৩ হাজার হেক্টরের বেশি পুড়িয়ে দিয়েছে, যা স্প্যানিশ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানল হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তুরস্কেও শত শত বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছে, তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও ফ্রান্সের জিরন্ড অঞ্চলে টানা তৃতীয় দিনের মতো দাবানল ছড়িয়ে পড়েনি। বৃহস্পতিবার শীতল আবহাওয়া ও কিছু বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এই দাবানলটি প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে, যা ১৯৪৯ সালের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় দাবানল। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি অঞ্চলকে কমলা তাপপ্রবাহ সতর্কতার আওতায় আনা হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা থেকে কার্যকর হবে।

কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ইউরোপ হচ্ছে দ্রুততম উষ্ণায়নশীল মহাদেশ, যা বিশ্বব্যাপী গড়ের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ইউরোপের জল সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে এবং আরও তীব্র দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে।