প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তথ্য অনুসন্ধান, লেখালেখি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট যেমন চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে সংবেদনশীল বা ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে আলোচনা করা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গুগলের বিশেষায়িত সার্চ ব্যবস্থায় অ্যানথ্রপিকের ক্লড এআইয়ের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার ঘটনা এ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। অ্যানথ্রপিক দ্রুত ওই ত্রুটি সংশোধন করলেও, এই ঘটনা সব এআই ব্যবহারকারীর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা শুধু সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না, বরং ব্যবহারকারীর সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই চ্যাটবটে গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। নিয়মিত সেগুলো ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব।

চ্যাটজিপিটিতে গোপনীয়তা বাড়ানোর জন্য প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে অ্যাকাউন্ট ছাড়াই ব্যবহারের পদ্ধতি। কোনো কথোপকথন অ্যাকাউন্টের ইতিহাসে রাখতে না চাইলে সাইন আউট করে চ্যাট শুরু করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু উন্নত সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না এবং ব্যবহারের সীমাও কম থাকবে। সংবেদনশীল বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে এটি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাউন্টে সাইন ইন থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো কথোপকথন সংরক্ষণ করতে না চাইলে অস্থায়ী চ্যাট সুবিধা ব্যবহার করা যায়। চ্যাটজিপিটির ডান পাশে ওপরে থাকা অস্থায়ী চ্যাট আইকনে ক্লিক করলেই এই সুবিধা চালু হয়। এতে কথোপকথন চ্যাট ইতিহাসে যুক্ত হবে না এবং ভবিষ্যতের উত্তর তৈরিতেও ব্যবহার করা হবে না। তবে অতিসংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

তৃতীয়ত, চ্যাটজিপিটির কার্যক্ষমতা উন্নত করতে ওপেনএআই ব্যবহারকারীদের কিছু কথোপকথন ব্যবহার করে, যদিও প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে যে এসব তথ্য পরিচয় গোপন রেখেই বিশ্লেষণ করা হয়। তবু চাইলে সেটিংস থেকে 'ডেটা কন্ট্রোলস'-এ গিয়ে 'ইমপ্রুভ দ্য মডেল ফর এভরিওয়ান' সুবিধাটি বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, চ্যাটজিপিটির কোনো কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ওয়েবসংযোগের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা যেতে পারে। তবে শেয়ার করা ওয়েবসংযোগ সক্রিয় থাকা পর্যন্ত যে কেউ সেটি দেখতে পারে। তাই ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য থাকলে এভাবে চ্যাট শেয়ার না করাই ভালো। পঞ্চমত, সংবেদনশীল কোনো কথোপকথন আর সংরক্ষণ করতে না চাইলে সহজেই সেটি মুছে ফেলা যায়। সংশ্লিষ্ট চ্যাটের পাশে থাকা তিনটি ডট মেনুতে ক্লিক করে 'ডিলিট' নির্বাচন করলেই কথোপকথনটি মুছে যাবে।

অন্যদিকে, জেমিনাইতেও গোপনীয়তা বাড়ানোর জন্য অনুরূপ পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত, জেমিনাইতে অস্থায়ী চ্যাট সুবিধা চালু থাকলে কথোপকথন চ্যাট ইতিহাসে দেখা যাবে না এবং তা এআই প্রশিক্ষণ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা হবে না। তবে এ ধরনের কথোপকথন সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডিফল্টভাবে গুগল জেমিনাইয়ের সঙ্গে হওয়া কথোপকথন সংরক্ষণ করে এআই উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারে। এটি বন্ধ করতে জেমিনাই অ্যাপস অ্যাক্টিভিটির 'কার্যক্রম সংরক্ষণ' সুবিধা বন্ধ করতে হবে। এতে নতুন কথোপকথন আর ইতিহাসে সংরক্ষিত হবে না এবং চাইলে এখান থেকেই আগের কার্যক্রমও মুছে ফেলা যাবে।

তৃতীয়ত, জেমিনাইতে কোনো কথোপকথন শেয়ার করলে একটি পাবলিক লিংক তৈরি হয়। প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও সেটি সক্রিয় থাকলে অন্যরা তা ব্যবহার করতে পারে। তাই নিয়মিত সেটিংসের 'ইয়োর পাবলিক লিংকস' অংশে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় লিংক মুছে ফেলা উচিত এবং চাইলে একসঙ্গে সব লিংক সরিয়ে দেওয়া যায়। চতুর্থত, জেমিনাই লাইভে ভয়েসে কথা বললে সেই অডিও এবং শেয়ার করা পর্দার তথ্য গুগল সংরক্ষণ করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রেখে মানব পর্যালোচকদের কাছেও পাঠানো হয়। এটি বন্ধ করতে সেটিংস থেকে 'অ্যাক্টিভিটি' অংশে গিয়ে সংশ্লিষ্ট অপশনটি বন্ধ করতে হবে। পঞ্চমত, 'পারসোনাল ইন্টেলিজেন্স মেমোরি' সুবিধা চালু থাকলে জেমিনাই আগের কথোপকথন মনে রাখে এবং ব্যবহারকারীর আগ্রহ, অভ্যাস ও পছন্দ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। যদিও এতে উত্তর আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, কিন্তু গোপনীয়তার স্বার্থে অনেকে এই সুবিধা বন্ধ রাখতে পছন্দ করেন। সেটিংস থেকে 'পারসোনাল ইন্টেলিজেন্স' অংশে গিয়ে 'মেমোরি' সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া যায়।