প্রতি রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় যেন কোটি কোটি নক্ষত্র স্থির হয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্ব ক্রমাগত পরিবর্তনশীল—নতুন নক্ষত্রের জন্ম, পুরোনোর মৃত্যু, গ্রহাণুর দ্রুত গতি এবং সুপারনোভার বিস্ফোরণ সব সময় ঘটছে। এই পরিবর্তনশীল মহাবিশ্বের একটি দীর্ঘমেয়াদী চিত্র ধারণ করার জন্য চিলির ভেরা রুবিন অবজারভেটরি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ শুরু করেছে। আগামী দশ বছর ধরে তারা রাতের আকাশের সবচেয়ে নিখুঁত ও বিস্তৃত ছবি সংগ্রহ করবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে লিগ্যাসি সার্ভে অব স্পেস অ্যান্ড টাইম (এলএসএসটি)। বিজ্ঞানীরা একে 'মহাবিশ্বের দশ বছরের মুভি' বলে অভিহিত করছেন, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সম্ভব হচ্ছে।
এই প্রকল্পের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেলজকো ইভজিক জানিয়েছেন, এই সার্ভেটির অনন্যতা হলো এত বিশাল আকাশ (পুরো আকাশের অর্ধেক), এত নিখুঁত সংবেদনশীলতা এবং টানা দশ বছর ধরে বারবার পর্যবেক্ষণের সুযোগ—একক কোনো গবেষণায় আগে কখনো মেলেনি। মূল কাজ শুরুর আগেই এই মানমন্দির ১১ হাজার গ্রহাণু আবিষ্কার করে ফেলেছে।
টেলিস্কোপটির নকশা অত্যন্ত উন্নত। এতে রয়েছে ৮ মিটার চওড়া একটি বিশাল আয়না, যার সবচেয়ে উদ্ভাবনী দিক হলো প্রাইমারি ও টারশিয়ারি আয়নাকে একই তলে যুক্ত করা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই প্রথমবার। সাধারণত বড় টেলিস্কোপের সমস্যা হলো তাদের বিশাল ওজন ও ধীরগতি। কিন্তু দুটি আয়নাকে একত্রিত করার ফলে এই টেলিস্কোপটি দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে। এর মাউন্ট এতই উন্নত যে মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ন্যূনতম কম্পন ছাড়াই এটি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলে।
এই অবজারভেটরির সবচেয়ে বিস্ময়কর উপাদান হলো এর ক্যামেরা। আপনার স্মার্টফোনের ক্যামেরা হয়তো ৫০ বা ১০০ মেগাপিক্সেলের, কিন্তু এই দানবীয় ক্যামেরার রেজল্যুশন ৩২০০ মেগাপিক্সেল! এর ওজন প্রায় ৩ হাজার কেজি, যা একটি মাঝারি আকারের গাড়ির সমান। লেন্সটি এত বড় যে এক ক্লিকে এটি আকাশের যে অংশের ছবি তোলে, তা আকাশে পাশাপাশি রাখা ৪৫টি পূর্ণিমার চাঁদের সমান। এই ক্যামেরা এত নিখুঁত যে ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে একটি ছোট গলফ বলের ছবি স্পষ্টভাবে তুলতে পারে। একটি সম্পূর্ণ রেজল্যুশনের ছবি দেখতে হলে ৩৭৮টি ফোর-কে আল্ট্রা-এইচডি টেলিভিশন পাশাপাশি সাজাতে হবে।
এই অভিযানের লক্ষ্য কী? এর অসাধারণ সংবেদনশীলতার কারণে এলএসএসটি প্রায় ৪ হাজার কোটি মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে পারবে। পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি, অর্থাৎ এই ক্যাটালগে পৃথিবীর জনসংখ্যার পাঁচ গুণের বেশি মহাজাগতিক বস্তুর তালিকা থাকবে। এই প্রযুক্তি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য এক গেম চেঞ্জার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্পূর্ণ ডেটা বছরে একবার প্রকাশিত হবে, তবে প্রতি রাতে যখনই আকাশে কোনো নতুন বা অদ্ভুত কিছু ধরা পড়বে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজ্ঞানীদের কাছে লক্ষ লক্ষ নোটিফিকেশন চলে যাবে। এই অদ্ভুত জিনিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হতে পারে আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু, যেমন ধূমকেতু ৩আই/অ্যাটলাস, যা অন্য সৌরজগত থেকে আমাদের সৌরজগতে এসেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই অবজারভেটরি ব্যবহার করে এমন কয়েক ডজন ভিনদেশি বস্তু আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।

