জাপানের ইয়েনের ক্রমাগত দরপতন একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সূত্রপাত ঘটাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ফোর্বস মিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও চেয়ারম্যান স্টিভ ফোর্বস। তিনি মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলার পথ যদিও আশ্চর্যজনকভাবে সোজা, তবু নীতিনির্ধারকরা জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ইয়েন সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে ৪০ বছরের সর্বনিম্ন মানে পৌঁছায়। মুদ্রার মান আরও কমে গেলে তা জাপানের অভ্যন্তরে গুরুতর মুদ্রাস্ফীতিই শুধু নয়, বরং আস্থার এক সংকট তৈরি করে সারা বিশ্বের আর্থিক বাজারগুলোকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঠিক এই কারণে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সম্প্রতি একটি অত্যন্ত বিরল যৌথ উদ্যোগে ইয়েনের দর চাঙা করতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে। তারা ডলার ব্যবহার করে ইয়েন কেনে। এই প্রচেষ্টা প্রাথমিক সাফল্যও পেয়েছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, জাপানের অভ্যন্তরীণ কিছু প্রতিকূল অবস্থার কারণে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এই অবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩.৫% সুদহারের বিপরীতে জাপানের মাত্র ১% এর স্বল্পমেয়াদি সুদহার; যুক্তরাষ্ট্রের অনুপাতে প্রায় দ্বিগুণ জাতীয় ঋণ; জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য; এবং ক্রমহ্রাসমান ও বার্ধক্যগ্রস্ত জনসংখ্যা।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের তাৎক্ষণিক দুশ্চিন্তার কারণ হলো, ইয়েনকে দরপতনের হাত থেকে বাঁচাতে জাপান তাদের ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের ট্রেজারি বন্ড ও বিলের পোর্টফোলিও এবং জার্মান ও ব্রিটিশ বন্ড বিক্রি করা শুরু করতে পারে। এ ধরনের বড় আকারের বন্ড বিক্রি সুদের হারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ইতোমধ্যেই আমেরিকার বিশাল বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন ও নবায়নযোগ্য প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরনো ঋণ পরিশোধের বিষয়টি বাজারগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই উৎকণ্ঠার ফলেই ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বেসেন্ট চাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ২০২০ সালে মহামারিজনিত ডলার সংকট মোকাবিলায় তৈরি করা একটি ব্যবস্থাকে এখন ইয়েনকে সাহায্য করতে শক্তিশালী করুক। বিকল্পভাবে তিনি 'এক্সচেঞ্জ স্টেবিলাইজেশন ফান্ড' নামের মহামন্দা আমলের আরেকটি তহবিলও কাজে লাগাতে পারেন। ধারণাটি হলো, এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে জাপান তাদের ট্রেজারি হোল্ডিংস জামানত রেখে ডলার ধার করতে পারবে। এতে করে কোনো বন্ড বিক্রির প্রয়োজন পড়বে না।

স্টিভ ফোর্বসের মতে, এই ধরনের সহায়তা ভালো, কিন্তু সংকট নিরসনে আরও ভালো ও প্রত্যক্ষ উপায় রয়েছে। জাপানের উচিত তাদের অযৌক্তিকভাবে কম রাখা স্বল্পমেয়াদি সুদের হার বাড়ানো। আরও জরুরি একটি ভুলের অবসান ঘটানো। যখন জাপান ইয়েন কেনার জন্য ডলার ব্যবহার করে, তখন সেই কেনা ইয়েনকে আবার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে দেয়। এটি একটি পুলের এক প্রান্ত থেকে বালতি ভরে পানি নিয়ে অন্য প্রান্তে ফেলে দেওয়ার মতোই; অর্থাৎ ইয়েনের সরবরাহ আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকে। তাই ইয়েনকে শক্তিশালী করতে জাপানের পূর্ববর্তী সব হস্তক্ষেপই ব্যর্থ হয়েছে।

উভয় দেশের জন্য আরেকটি কার্যকর পন্থা হবে ডলার ও ইয়েনের মধ্যে একটি স্থিতিশীল বিনিময় হার চাওয়ার ঘোষণা দেওয়া। এমনকি তারা ১৫০ থেকে ১৫৫ ইয়েন প্রতি ডলারের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে এবং তা বজায় রাখতে ব্যাপক বাজার হস্তক্ষেপের অঙ্গীকার করতে পারে। প্রয়োজনে জাপান ইয়েনের সরবরাহ কমিয়ে এই সীমার মধ্যে রাখবে। এই পদক্ষেপগুলো তাৎক্ষণিক সংকট নিরসনে কার্যকর হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে জাপানকে বড় ধরনের করহার হ্রাস করে একটি চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করতে হবে। তিনি তুলে ধরে যে, যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসা খাতে সম্মিলিত করের হার ১২.৪%, সেখানে জাপানে এটি ৩০% এরও বেশি। জাপানের বিক্রয় কর, ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট করের হারও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি।