ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিতর্ক উঠলেও তাঁর অবস্থান এখনো শক্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে চলমান বিশ্বকাপ নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফিফা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ঘটনাটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোনের পর ফিফা এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছেন, 'আমিই তাদের দিয়ে এটা করিয়েছি।' ইনফান্তিনো অবশ্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, যার নেতৃত্বে আছেন ট্রাম্প, যিনি ইনফান্তিনোর 'বন্ধু' বলে পরিচিত। ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হলেও ফিফার নিজস্ব নিয়মই প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। গত ডিসেম্বরে 'ফেয়ারস্কয়ার' নামক মানবাধিকার সংগঠন ফিফার নৈতিক কমিটির কাছে অভিযোগ করে যে, বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' দিয়ে ফিফা তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু সেই অভিযোগের কোনো জবাব মেলেনি। সম্প্রতি ৫০ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য নৈতিক কমিটিকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নতুন চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে এবারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এদিকে বিশ্বকাপে টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তিনটি মহাদেশে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ফিফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে। ফলে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাবে শুধু এশিয়া বা ওশেনিয়ার কোনো দেশ। কোনো প্রতিযোগী না থাকায় এই নিয়মের কারণে পরোক্ষভাবে সৌদি আরবের বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ইনফান্তিনোর আমলে সৌদি আরবের সঙ্গে ফিফার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় এই সুযোগ পেয়েছে বলে আলোচনা চলছে। নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন এই প্রক্রিয়ায় ভোট দেয়নি। তাদের যুক্তি, আয়োজক খোঁজার এই প্রক্রিয়া ফিফার 'ভালো শাসনের সংস্কারকে বাধা দিয়েছে এবং ফিফার ওপর মানুষের বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।' ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন 'ফিফপ্রো'-এর সভাপতি সার্জিও মার্চি গত বছর বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টটি তৈরি করা হয়েছে কোনো আলোচনা ছাড়াই। ফিফার এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে উয়েফা। সংস্থাটি বলেছে, ফিফা এখানে 'সব সীমা লঙ্ঘন করেছে' এবং একে 'নজিরবিহীন বোধগম্যতাহীন ও অন্যায় সিদ্ধান্ত' বলে অভিহিত করেছে। গত বছরের মে মাসে উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিনের নেতৃত্বে একদল ইউরোপীয় প্রতিনিধি ফিফা কংগ্রেসের একটি বিরতির সময় সভাকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে। তখন ইনফান্তিনো ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনৈতিক সফর শেষে ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট দেরিতে সভায় এসেছিলেন। বিশ্বকাপেও উয়েফা কিছু চাল চালার চেষ্টা করেছে। গত মাসে সোমালি রেফারি ওমর আরতান দেশে ফেরার পরপরই উয়েফা ঘোষণা করে, আগামী ১২ আগস্ট পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার উয়েফা সুপার কাপ ম্যাচটি পরিচালনার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর আগে সোমালিয়ার বর্ষসেরা রেফারি আরতানকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে ইনফান্তিনো রসিকতা করে বলেছিলেন, 'আরে ভাই, শান্ত থাকুন, রিল্যাক্স করুন।' সমালোচনার ঝড় থাকলেও ইনফান্তিনোর অবস্থান যে নড়বড়ে নয়, তা বোঝা যায় বিশ্বের বিভিন্ন ফুটবল ফেডারেশনের সমর্থন থেকে। ইনফান্তিনোর 'ফিফা ফরোয়ার্ড' কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফুটবল প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এবং বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়ে তিনি অনগ্রসর দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছেন। চলতি বিশ্বকাপে আরও ১৬টি অতিরিক্ত দেশ অংশ নিতে পেরেছে, যার সিংহভাগই এসেছে কম শক্তিশালী কনফেডারেশন থেকে। ইনফান্তিনো এমন সব দেশকে স্বপ্ন ও আশা দেখিয়েছেন, যারা আগে কখনো বিশ্বকাপে খেলার কথা ভাবতেও পারত না—যেমন কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান। ফিফার আয়ের একটি বড় অংশই আসে বিশ্বকাপের টিকিটের চড়া দাম থেকে। চলতি বছর ফিফা প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উয়েফা ফিফার অনেক নীতির বিরোধিতা করলেও নিজেদের অর্থায়ন নিজেই করতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বাকি দেশগুলো ইনফান্তিনো ও ফিফার তৈরি করা এই আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফিফার অধীনে মোট ২১১টি দেশ রয়েছে। সভাপতি নির্বাচনে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে এবং জেতার জন্য ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়। গত এপ্রিলে কনমেবল জানায়, তাদের ১০টি দেশই ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে। এর তিন সপ্তাহ পর ক্যাফ তাদের ৫৪টি সদস্য দেশের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোকে পূর্ণ সমর্থনের কথা নিশ্চিত করে। এর পরপরই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের ৪৭টি দেশও একই পথ অনুসরণ করে। অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর ঝুলিতে ইতিমধ্যেই ১১১টি ভোট নিশ্চিত হয়ে আছে। তাঁকে হারানো অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিতর্কের ঝড়, তবুও তাঁর অবস্থান শক্ত
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ফিফা শান্তি পুরস্কার ও ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়ে একের পর এক বিতর্ক উঠলেও তাঁর পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন ও ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচি তাকে শক্ত অবস্থান দিয়েছে।




